“স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ” – প্রেক্ষিত পূর্ব পাকিস্তান – শীর্ষক প্রতিবেদন

ক) সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনঃ

আইয়ুব খানের শাসনামলে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলে পূর্ব-পাকিস্তানের আপামর জনগণ ও ছাত্ররা নিচে তার বর্ণনা করা হলোঃ-

১৯৬২ সালের ২৪ জানুয়ারি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভাপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর উদ্যোগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কয়েকজন নেতা আতাউর রহমানের বাসভবনে সরকার বিরোধী এক গোপন বৈঠকে মিলিত হন। ৩০ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী করাচি গেলে তাঁকে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। এ সংবাদ পরদিন পূর্ব পাকিস্তানের পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে এ অঞ্চলের ছাত্র সমাজ সরকার বিরোধী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এবং এর মধ্যদিয়ে আন্দোলনের প্রথম পর্বের সূচনা হয়। এর প্রতিবাদে ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ ৩১ জানুয়ারি গভীর রাতে মধুর ক্যান্টিনে বৈঠকে মিলিত হয় এবং পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বাÍক ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘটের সংবাদ পত্রিকায় ছাপানো না হওয়ায় ২ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা মিছিল নিয়ে প্রেসক্লাবে যায় এবং সরকারি পত্রিকা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। ৩ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মঞ্জুর কাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সফরে আসলে ছাত্ররা তাকে নাজেহাল করে। [সকল এসাইনমেন্ট সবার প্রথমে পেতে ভিজিট করুন NewResultBD.Com] ৪ ও ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার দেয়ালগুলো সামরিক সরকারবিরোধী লেখায় ভরে যায়। ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সরকার অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। এর প্রতিবাদে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন মিছিল বের করে এবং উত্তেজিত ছাত্ররা পুলিশের বাস পুড়িয়ে দেয়। ৭ ফেব্রুয়ারি পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী স্বয়ং আইয়ুব খানকেই ঘেরাও করার কর্মসূচি নেওয়া হয়। ফলে ৭ ও ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঢাকায় ব্যাপক পুলিশী নির্যাতন চলতে থাকে এবং এ সময়ের মধ্যে প্রায় ২২৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর প্রতিবাদে পূর্ববাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলেও আন্দোলন প্রবল আকার ধারণ করে। মার্চ মাসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ খুললে আবার আন্দোলন শুরু হয়। ১৫ মার্চ থেকে অব্যাহতভাবে ধর্মঘট চলতে থাকে। এ সময় ডাকসুর সহ-সভাপতি রফিকুল হক ও ছাত্র ইউনিয়ন নেতা হায়দার আকবর খান প্রমুখ নেতাসহ বহু ছাত্রকে গ্রেফতার করে জেলে বন্দি করা হয়।

খ) পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্য ও ছয় দফাঃ

পশ্চিম পাকিস্তানের সরকার পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি চরম অন্যায় ও বৈষম্য প্রদর্শন করে এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলার জনগণ ছয় দফা দাবি পেশ করে নিচে তার ব্যাখ্যা দেওয়া হলঃ-

পূর্ব বাংলায় জনসংখ্যা বেশি থাকলেও ক্ষমতা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানীদের হাতে। যে কারণে তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর নির্মম অত্যাচার ও চরম বৈষম্যে প্রদর্শন করে। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ন্যায্য অধিকার কেড়ে নেয়। তারা আরো কেড়ে নেয় মানুষের মৌলিক অধিকার। পূর্ব বাংলার মানুষের অবস্থা যখন চরম খারাপ পর্যায়ে পৌঁছাতে শুরু করে। তখন এদেশের আপামর জনগণ বুঝতে পারে মাঠে ময়দানে তারা দাবী আদায় করতে পারবে না। এজন্য বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ছয় দফা দাবি পেশ করা হয়। এবং তারই ভিত্তিতে আন্দোলন করা হয় এবং আইয়ুব খানের পতন ঘটে। নিচে ছয় দফার বিষয়বস্তু বর্ণনা করা হলো :

১ম দফাঃ শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রীয় প্রকৃতি: ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়নপূর্বক পাকিস্তানকে একটি সত্যিকার যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে গঠন করতে হবে। এই যুক্তরাষ্ট্রের সরকার হবে পার্লামেন্টারি পদ্ধতির। প্রাপ্তবয়স্কদের সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইন সভাগুলো হবে সার্বভৌম।

২য় দফাঃ কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা: যুক্তরাষ্ট্র (কেন্দ্রীয়) সরকারের হাতে থাকবে দেশরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি। অবশিষ্ট সকল বিষয় অঙ্গরাজ্যসমূহের হাতে থাকবে।

৩য় দফাঃ মুদ্রা ও অর্থ ব্যবস্থা: এ দফায় দেশের মুদ্রা ব্যবস্থা সম্পর্কে দু’টি বিকল্প প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়

ক. দেশের দু’অঞ্চলের জন্য সহজে বিনিময়যোগ্য দু’টি মুদ্রা চালু থাকবে। এ ব্যবস্থায় মুদ্রার লেনদেন হিসাব রাখার জন্য দু’অঞ্চলে দু’টি স্বতন্ত্র স্টেট ব্যাংক থাকবে এবং মুদ্রা ও ব্যাংক পরিচালনার ক্ষমতা থাকবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে। অথবা

খ. দুই অঞ্চলের জন্য একই মুদ্রা থাকবে, তবে শাসনতন্ত্রে এমন ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে এক অঞ্চল থেকে মুদ্রা ও মূলধন অন্য অঞ্চলে পাচার হতে না পারে। এ ব্যবস্থায় পাকিস্তানে একটি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে এবং দু’অঞ্চলের জন্য দু’টি পৃথক রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে।

৪র্থ দফাঃ রাজস্ব, কর ও শুল্ক বিষয়ক ক্ষমতা: সকল প্রকার ট্যাক্স, খাজনা ও কর ধার্য এবং আদায়ের ক্ষমতা থাকবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে। আঞ্চলিক সরকারের আদায়কৃত অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ সঙ্গে সঙ্গে ফেডারেল তহবিলে জমা হবে। শাসনতন্ত্রে এ ব্যাপারে রিজার্ভ ব্যাংকসমূহের ওপর বিধান থাকবে।

৫ম দফাঃ বৈদেশিক মুদ্রা ও বৈদেশিক বাণিজ্য: বৈদেশিক মুদ্রা ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রদেশগুলোর হাতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা থাকবে। বৈদেশিক বাণিজ্য ও সাহায্যের ব্যাপারে প্রদেশগুলো যুক্তিযুক্ত হারে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা মিটাবে।

৬ষ্ঠ দফাঃ প্রতিরক্ষা: আঞ্চলিক সংহতি ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে প্রদেশগুলোকে নিজস্ব কর্তৃত্বাধীনে আধাসামরিক বাহিনী বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন ও পরিচালনা করার ক্ষমতা দেওয়া হবে।

গ) ঐতিহাসিক আগরতলা মামলা ও গণঅভ্যুত্থানঃ

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানে দায়ের করা একটি রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার আওয়ামী লীগ নেতা ও পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫জন বিশিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করেছিল। ১৯৬৮ সালের প্রথম ভাগে দায়ের করা এই মামলায় অভিযোগ করা হয় যে, শেখ মুজিব ও অন্যান্যরা ভারতের সাথে মিলে পাকিস্তানের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। এই মামলাটির পূর্ণ নাম ছিল রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যান্য মামলা। তবে এটি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসাবেই বেশি পরিচিত, কারণ মামলার অভিযোগে বলা হয়েছিল যে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় কথিত ষড়যন্ত্রটি শুরু হয়েছিল। মামলা নিষ্পত্তির চার যুগ পর মামলার আসামি ক্যাপ্টেন এ. শওকত আলী ২০১১ সালে প্রকাশিত একটি স্বরচিত গ্রন্থে এ মামলাকে সত্য মামলা বলে দাবি করেন।

‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যান্য’ শিরোনামের মামলার অভিযোগনামায় উল্লেখ করা হয়েছিল যে,

অভিযুক্তরা ভারতীয় অর্থ ও অস্ত্রের সাহায্যে সশস্ত্র সংঘর্ষ ঘটিয়ে কেন্দ্র থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে চেয়েছিল।

মামলার স্থান হিসেবে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে অবস্থিত ‘সিগন্যাল অফিসার মেসে’ নির্ধারণ করা হয়। মামলাটির শেষ তারিখ ছিল ৬ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯ সালে।

গণঅভ্যুত্থানঃ

৬ দফা দাবি না মানার কারণে বাংলার জনগণ পুরোপুরি বুঝতে পারে পাকিস্তান তাদের শত্রু এবং তাদেরকে মাঠে ময়দানে থেকেই ন্যায্য অধিকার আদায় করে নিতে হবে এর মাধ্যমে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ঘটে যায় নিম্নে দেওয়া হল:

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ঊনসত্তরে জনগণের আন্দোলন যে কেবল ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছিল তাই নয়, এর মাধ্যমে আইয়ুব খানের শাসনামলে সাধিত ‘উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি’র যথার্থ রূপটিও পৃথিবীর সামনে উন্মোচিত হয়ে পড়ে। ছাত্র অসন্তোষকে কেন্দ্র করে ১৯৬৮ সালের নভেম্বরে যে প্রাথমিক ঘটনাবলির সূত্রপাত তা পরবর্তীকালে কেবলমাত্র ছাত্র সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ছড়িয়ে পড়ে শ্রমিক-কৃষক ও ব্যাপক সাধারণ মানুষের মধ্যে। একটি সাধারণ দাবি- আইয়ুবের পতনকে কেন্দ্র করে প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের দু’অংশের মানুষ এ সময়ে একযোগে পথে নামে। এ অভ্যুত্থানের পরিণতিতে শুধু আইয়ুব খানেরই পতন ঘটেনি বরং স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট সূচিত হয় দেশ বিভাগ ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের সূচনা থেকেই। [সকল এসাইনমেন্ট সবার প্রথমে পেতে ভিজিট করুন NewResultBD.Com] ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পর থেকেই কেন্দ্রীয় সরকার স্বায়ত্তশাসন ইস্যুতে প্রতিক‚লতার সম্মুখীন হতে থাকে। স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে ১৯৪৯ সালে পূর্ববাংলা থেকে সংগঠিত দাবি প্রথম উচ্চারিত হয়। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ববঙ্গের জন্য আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতিদানের দাবি উত্থাপন করে। তবে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে তদানীন্তন পূর্ববাংলায় আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে ১৯৫০ সালের সংবিধান প্রণয়নের লক্ষে গঠিত মৌলিক নীতিমালা কমিটি কর্তৃক উত্থাপিত প্রস্তাবের বিপক্ষে। প্রস্তাবটিতে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলা হয় এবং প্রদেশসমূহকে কার্যকরীভাবে কোন স্বায়ত্তশাসন প্রদান করার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়। ১৯৬৮ সালের শেষপর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে বিভিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন জোরদার হতে থাকে এবং ‘৬৯ সালের শুরু থেকে আইয়ুব খানের পদত্যাগ পর্যন্ত গণআন্দোলন ব্যাপক রূপধারণ করে গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। এসময়কার পাকিস্তানের ইতিহাস ছিল ঘটনাবহুল ও তাৎপর্যময়। ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান বলতে এ সময়কেই বুঝানো হয়। এ সময়ের ঘটনাসমূহকে ৩টি পর্যায়ে ভাগ করা যায়। যথা

প্রথম পর্যায়: ১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি থেকে ১৯ জানুয়ারি

দ্বিতীয় পর্যায়: ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি

তৃতীয় পর্যায়: ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৫ মার্চ

ঘ) স্বাধীকার থেকে স্বাধীনতাঃ

বাঙালিরা প্রথমেই স্বাধীনতার যুদ্ধ করতে চাই নি এমনকি যুদ্ধ জড়াতে চায়নি তারা। কিন্তু পাকিস্তানি সরকার বাঙালিদের উপর অত্যাচার ও নির্যাতনের মাত্রা দিন দিন বাড়িয়ে যাচ্ছিল এ থেকেই বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন করে স্বাধীনতা আন্দোলনে পরিণত হয় এই সম্বন্ধে বিস্তারিত বর্ণনা করা হলো:

বাঙালিরা যখন এটা বুঝতে পেরে আন্দোলনে যুক্ত হলো এবং নির্বাচনে বিজয়ী হলো তখন পাকিস্তানিদের শোষণের ভিত নড়ে উঠল এবং ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করল তারা। এক পর্যায়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী বাংলাদেশের নাগরিকদের নিধনের জন্য ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’-এর নামে চূড়ান্ত নিধন ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, আর ২৫শে মার্চ রাতেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং গ্রেফতার হন। ২৬শে মার্চ বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে, যা পরবর্তীকালে সশত্র মুক্তিসংগ্রামের রূপ লাভ করে। মাত্র ৯ মাসের ব্যবধানে ৩০ লাখ প্রাণের এবং ২ লাখ নারীর সম্মানের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।

ইতিহাসের এত বড় একটা নিষ্ঠুর জেনোসাইডের জন্য পাকিস্তান বিশ্ববিবেক তো দূরের কথা, বাংলাদেশের কাছেও কখনো ক্ষমা প্রার্থনা করেনি। বিশ্বের কোনো আদালত এত বড় একটা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করেনি। পাকিস্তান এখন পর্যন্ত এত বড় একটা ধ্বংসযজ্ঞকে কোনো না কোনোভাবে সঠিক ভাবার চেষ্টা করে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো সুযোগসন্ধানী ঘোষণার ফসল নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুতির আহ্বান ছিল। ছিল অনুসরণীয় কৌশল এবং করণীয় নির্দেশনা এবং স্পষ্ট ঘোষণা—যার উত্স বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ। ৭ই মার্চের ভাষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল এবং এই স্বাধীনতার ঘোষণা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো একজন সার্বভৌম ব্যক্তিত্বের পক্ষেই দেওয়া সম্ভব। স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল কিন্তু কোনো বিচ্ছিন্নতার সুর ছিল না। জনযুদ্ধের প্রস্তুতির আহ্বান ছিল কিন্তু জনযুদ্ধে আগাম ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশনা ছিল না। বাঙালি বাংলাদেশের স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার আন্দোলনের সব সময় সাংবিধানিক নিষ্পত্তি চেয়েছে।

কিন্তু বাধ্য হয়েই বাঙালি তাদের সীমিত সামর্থ্য দিয়ে পাকিস্তানি শাসকগোঠী ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং জনযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। জনযুদ্ধের ভিত্তি ছিল বাঙালির বাঁচা-মরার লড়াই, কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়। ফলে বিশ্বজনমত পাকিস্তানের সশস্ত্র বর্বরতার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের আপামর জনতার সশস্ত্র সংগ্রামে অফুরন্ত সমর্থন জানায় এবং সহায়তায় এগিয়ে আসে। এগিয়ে আসে ভারতীয় মিত্রবাহিনী, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মানবতার স্বার্থে বাংলাদেশের সশস্ত্র সংগ্রামে সাহায্যের হাত প্রসারিত করে ১ কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে। বিশ্ববিবেকের কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আগ্রাসন নয় বরং ন্যায্যতা পায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top