সামাজিক অবক্ষয় রোধে ইসলামি শিক্ষার গুরুত্ব বিশ্লেষণ।

ইসলামি শিক্ষার ধারণা : ইসলাম শিক্ষার আরবি প্রতিশব্দ হলো ইলম এর অর্থ হলো- জ্ঞান, জানা, অবগত হওয়া ইত্যাদি। ইসলামি পরিভাষায় কুরআন ও হাদিসভিত্তিক এমন জ্ঞান অন্বেষণ করা যার মাধ্যমে ইসলামি জীবনব্যবস্থার ওপর চলা সহজ হয়। ইলম দ্বারা বোঝায় মহান আল্লাহকে জানবার জ্ঞান এবং এ অর্থে দ্বীন বিষয়ক যেকোনো জনকে ইসলাম শিক্ষা বলা হয়।

ইসলাম শিক্ষার পরিচয় এভাবেও দেওয়া যায়, ইসলাম শিক্ষা এমন একটি বিষয় যার পঠন পাঠন, অধ্যয়ন, অনুশীলন করলে আল্লাহর দেওয়া বিধান পরিপূর্ণ জীবন বিধান-দীন ইসলামের স্বরূপ সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করা যায় এবং তদনুযায়ী স্বীয় জীবন গঠন ও পরিচালনা করে আল্লাহ প্রদত্ত খেলাফতের দায়িত্ব -কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা যায়। এ জ্ঞান মানুষের মহামূল্যবান সম্পদ, যা মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠ অবদান। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা,

“আল্লাহ তায়ালা তোমার প্রতি কিতাব ও হিকমত অবতীর্ণ করেছেন আর তুমি যা জানতে না তা তোমাকে শিক্ষা দিয়েছেন। তোমার প্রতি আল্লাহর মহানুগ্রহ রয়েছে।” (সূরা নিসা : ১১৩)

সর্বোপরি, যে শিক্ষা মুসলিম দার্শনিক, মুসলিম বৈজ্ঞানিক, মুসলিম অর্থনীতিবিদ, মুসলিম ঐতিহাসিক সৃষ্টি করবে -তাই ইসলামি শিক্ষা নামে অবহিত হওয়ার যোগ্য।

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন দর্শন ও পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। মাবন জীবনের সমগ্র দিক ও বিভাগের জন্য এর নিজস্ব মূলনীতি ও বিধান রয়েছে। শিক্ষা ক্ষেত্রেও ইসলামের দিক নির্দেশনা রয়েছে। ইসলামী শিক্ষা বলতে বুঝায়- “যে শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামকে একটি পরিপূর্ণ জীবনাদর্শ হিসেবে শিক্ষা দেয়ার বন্দোবস্ত থাকে। তাই ইসলাম শিক্ষা।”

এ শিক্ষা লাভ করার ফলে শিক্ষার্থীদের মন-মগজ-চরিত্র এমনভাবে গড়ে ওঠে, যাতে ইসলামের আদর্শে জীবনের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার যোগ্যতা অর্জিত হয়। এক কথায়- “ইসলাম সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান লাভ করার শিক্ষাই হল ইসলামী শিক্ষা।” শিক্ষাই জীবনের আলো। জ্ঞান মানুষের মহামূল্যবান সম্পদ- যা মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠ অবদান।

এ মহামূল্যবান জ্ঞানের কল্যাণেই মানবজাতি ফেরেশতা তথা সমগ্র সৃষ্টি জগতের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন। আর এ কারণেই মানুষ মহান আল্লাহর প্রতিনিধি হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। ইসলামের শিক্ষা ব্যবস্থা এক স্বতন্ত্র বৈশেষ্ট্যের দাবীদার।

(খ) ইসলামি শিক্ষার উদ্দেশ্য : ইসলাম শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো- ইসলামকে সঠিকভাবে জানার ও মানার মাধ্যমে আল্লাহর খাঁটি গোলাম হিসেবে ব্যক্তি তৈরি করা এবং তার সন্তুষ্টি অর্জন করা। ফলে ইসলাম শিক্ষা মানুষের শারীরিক, মানসিক, নৈতিক ও আত্মিক বিকাশ সাধন করে মানুষকে সত্যিকারের মানুষে রূপান্তরিত করে। ইসলাম শিক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তি ও সমাজজীবনে মৌলিক পরিবর্তন সাধন সম্ভব হয়। এর কল্যাণে ব্যক্তি আদর্শ ও চরিত্রবান হয়, সুনাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সমাজ-রাষ্ট্র তথা বিশ্বের সম্পদে পরিণত হয়।

মানবতার বিকাশ সাধন: শিক্ষার প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য হলো মনুষ্যত্ব ও মানবিক গুণাবলীর বিকাশ সাধন করা। মানব প্রকৃতির মননশীলতা, সৃজনশীলতা ও কর্মকুশলতা শিক্ষার মাধ্যমেই বিকাশ লাভ করে।

কুরআন-হাদীসের জ্ঞান আহরণের মাধ্যমেই মনুষ্যত্বের প্রকৃত বিকাশ, আত্মার উন্নতি, আধ্যাত্মিক জগতের রহস্যাবলী, আল্লাহ ও সৃষ্টি-জগত সম্পর্কিত জ্ঞান অবগত হওয়া যায়। মানুষের মধ্যে স্নেহ-মমতা, দয়া, সাহস, দূরদর্শিতা, নেতৃত্ব ইত্যাদি মানবিক গুণাবলীও জ্ঞানার্জনের মাধ্যমেই উৎকর্ষ লাভ করে ও বিকশিত হয়। এ শিক্ষার গুণেই মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে সৃষ্টিজগতের উপরে। কুরআনের ভাষায়:

“নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে সম্মান দান করেছি।” (সূরা বনী ইসরাইল : ৭০)

স্রষ্টা ও সৃষ্টির পরিচয়ের জন্য শিক্ষা:

মহান স্রষ্টা আল্লাহর আনুগত্য ও বন্দেগী সম্পর্কে অবগত হওয়াও শিক্ষার উদ্দেশ্য। কেননা, আল্লাহ বলেন,
“আমি জিন ও মানব জাতিকে আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।” (যারিয়াত : ৫৬)

আল্লাহর আনুগত্য ও বন্দেগী করতে হলে প্রথমে আল্লাহর সঠিক পরিচয়, আনুগত্য ও বন্দেগীর ধরন এবং আদায় করার নিয়ম নীতি অবগত হওয়া একান্ত অপরিহার্য। আর শিক্ষা ব্যতীত এগুলো অবগত হওয়া যায় না। প্রকৃত জ্ঞানীরা আল্লাহর এ শিক্ষার গুণেই মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে সৃষ্টিজগতের উপরে। কুরআনের ভাষায়,

“নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে সম্মান দান করেছি।” (সূরা বনী ইসরাইল : ৭০)

স্রষ্টা ও সৃষ্টির পরিচয়ের জন্য শিক্ষা :

মহান স্রষ্টা আল্লাহর আনুগত্য ও বন্দেগী সম্পর্কে অবগত হওয়াও শিক্ষার উদ্দেশ্য। কেননা, আল্লাহ বলেন

“আমি জিন ও মানব জাতিকে আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।” (যারিয়াত : ৫৬)

আল্লাহর আনুগত্য ও বন্দেগী করতে হলে প্রথমে আল্লাহর সঠিক পরিচয়, আনুগত্য ও বন্দেগীর ধরন এবং আদায় করার নিয়ম নীতি অবগত হওয়া একান্ত অপরিহার্য। আর শিক্ষা ব্যতীত এগুলো অবগত হওয়া যায় না। প্রকৃত জ্ঞানীরা আল্লাহর স্বরূপ বুঝে তাঁর ইবাদাত করতে পারে। কুরআনে বলা হয়েছে,

“নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাহগণের মধ্যে কেবল বিদ্বানগণই আল্লাহকে ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)

সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস পোষণ মানুষের সকল কাজের চালিকা শক্তি। আর তা অর্জিত হয় ইসলামী শিক্ষার মাধ্যমে।

ইসলামী সংস্কৃতির সাথে পরিচয় লাভ : ইসলামী শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে ইসলামী শিক্ষা-সংস্কৃতির সাথে পরিচয়। অপসংস্কৃতি সম্পর্কে সম্যক ধারা। ইসলামের রয়েছে মানবতার ঊষালগ্ন থেকে চলে আসা সভ্যতা ও ঐতিহ্যের গৌরবময় উত্তরাধিকার। ইসলামের শিা, সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের অফুরন্ত ভাণ্ডারের সাথে পরিচয়ের জন্যে ইসলামী শিক্ষা খুবই জরুরী বিষয়।

শান্তিময় সুন্দর জীবনের জন্যে : মানুষের জীবনকে সুন্দর ও শান্তিময় করার জন্য ইসলামী শিক্ষা অপরিহার্য। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, জাতি ও আন্তর্জাতিক পর্যায় পর্যন্ত জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে সহায়তা করে ইসলামী শিক্ষা। মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর খলীফা। পৃথিবীতে মানুষের রয়েছে অনেক দায়িত্ব। এ দায়িত্বের প্রতি যত্নবান ও সচেতন করে তোলা ইসলামী শিক্ষার উদ্দেশ্য।

আল্লাহর দ্বীনকে সঞ্জীবিত রাখা : সমাজ জীবনে আল্লাহর দ্বীনকে সঞ্জীবিত করা ও প্রতিষ্ঠিত করার গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্বনবীর (স) তিরোধানের মাধ্যমেই নবুয়াতের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। তাঁর পরে আর কোন নবীর আগমন ঘটবেনা। নবীর উম্মাহর উপর দ্বীনের হিফাযত ও প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব বর্তিয়েছে। কাজেই আল্লাহর দ্বীন শিক্ষা করে একে সঞ্জীবিত রাখা ও প্রতিষ্ঠা করা “মুসলিম উম্মাহর” প্রধান কর্তব্য। এজন্য মুসলিম উম্মাহর ওলামায়ে কিরামকে নবীদের উত্তরসুরী বলা হয়েছে। মহানবী (স) ঘোষণা করেছেন :

“যে ব্যক্তি ইসলামকে সঞ্জীবিত করার উদ্দেশ্যে জ্ঞান শিক্ষা করতে করতে মৃত্যুমুখে পতিত হয়, জান্নাতের মধ্যে নবীগণ ও তার মধ্যে মাত্র একধাপ ব্যবধান থাকবে।”

আত্মকর্মসংস্থান : হালাল উপার্জনে উৎসাহিত করা ও আত্মকর্মসংস্থানে সক্ষম করে গড়ে তোলা ইসলামী শিক্ষার অন্যতম বড় উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাআলা যেমন বান্দাহকে সালাত, সাওম ও অন্যান্য ইবাদত করার আদেশ দিয়েছেন। তেমনি তিনি জীবিকা উপার্জনেরও নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেন

“সালাত সমাপন করে তোমরা পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহরাজি সন্ধান কর।” (সূরা জুমুআ : ১০)

মহানবী (স) জীবিকা উপার্জনকে ফরষ বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন :

“হালাল জীবিকা উপার্জন ফরযের পরেও একটি ফরয।” (বায়হাকী)

রাসূলুল্লাহ (স) আত্মকর্মসংস্থানের প্রতি খুবই তাকিদ দিয়েছেন। তিনি আরও ঘোষণা করেছেন :

“তোমরা ফজরের সালাত আদায় করার পর তোমাদের জীবিকার সন্ধান না করে ঘুমিয়ে যেওনা।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top