সরকারি অর্থায়ন এবং যৌথ মূলধনি ব্যবসায়ের অর্থায়নের সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য নিরূপণ।

(ক) অর্থায়নের ধারণা : পরিকল্পনা প্রণয়ন তহবিলের উৎস নির্ধারণ তহবিল সংগ্রহ এবং সংগ্রহীত তহবিল সুষ্ঠুভাবে বিভিন্ন প্রকল্পে বন্টন সংক্রান্ত কার্যাবলী সমষ্টিকে অর্থায়ন বলা হয়। মূলত ব্যবসায়ের কোন কাজ কিভাবে সম্পন্ন করা হবে, কোথা থেকে তহবিল সংগ্রহ করা হবে এবং কোথায় বন্টন করা হবে তার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা ব্যবস্থাপনাকে অর্থায়ন বলা হয়।ব্যবসায়ে কি পরিমাণ অর্থ কি কাজের জন্য প্রয়োজন অর্থ কোথা থেকে সংগ্রহ করা হবে এবং কোথায় বিনিয়োগ করা হবে সে সক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অর্থায়নের কাজ। অর্থায়ন মূলত দুই প্রকার। সরকারি ও বেসরকারি অর্থায়ন সরকারি ও বেসরকারি অর্থায়নে ধারণা বা বিষয়বস্তু তুলে ধরা হলো:

সরকারি অর্থায়ন : একটি দেশের রাষ্ট্র বা সরকার কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন আর্থিক নীতি ও আর্থিক পরিকল্পনা করা, আয়-ব্যয় বিশ্লেষণ, সম্পদের সুষ্ঠু বন্টন, মূল্যস্তরের ভারসাম্য রাখা ইত্যাদি সরকারি অর্থসংস্থানের মূল উদ্দেশ্য। সরকারের বিভিন্ন আর্থিক দপ্তরসমূহ বা প্রতিষ্ঠানসমূহ সরকারি অর্থায়নের নীতিমালা প্রণয়ন ও পরিকল্পনার দিকটির দায়িত্ব পালন করে, নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করেন। সরকারি অর্থায়নে মূল উদ্দেশ্য জনকল্যাণ ও সম্পদের সুষ্ঠু বন্টন মুনাফা অর্জন নয়। রাষ্ট্রকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ শত্রু থেকে দেশকে রক্ষা করা, বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ, জনকল্যাণ, উন্নয়ন এবং বিভিন্ন খাতে উন্নয়নমূলক কাজের জন্য সরকারকে বহুল অর্থ ব্যয় করতে হয় আর এই জন্য প্রয়োজনীয় অর্থসংস্থানই হল সরকারি অর্থায়ন। এ অর্থায়নের জন্য বা অর্থ সংস্থানের জন্য সরকারকে তহবিল সংগ্রহ করতে হয়। মূলত সরকার বিভিন্ন শুল্ক, রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে যেমন আবগারি শুল্ক আমদানি-রপ্তানি শুল্ক ইত্যাদি অর্থ সংস্থান করে থাকে। তাছাড়া বিভিন্ন দেশীয় ও বৈদেশিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ সংগ্রহ করেন।

বেসরকারি অর্থায়ন : সরকারি বা রাষ্ট্রীয় দপ্তরসমূহ ছাড়া যে সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আর্থিক নীতিমালা প্রণয়ন ও আর্থিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন তাকে বলা হয়। বেসরকারি অর্থায়ন মূলত তিন প্রকার যথা ব্যক্তিগত অর্থায়ন ব্যবসায় অর্থায়ন ও ব্যবসায় অর্থায়ন। অর্থনীতিতে মূলত বেসরকারি অর্থায়ন বলতে ব্যবসায় অর্থায়ন বা যৌথ মূলধনী ব্যবসায় অর্থায়ন কে বোঝায়। যৌথ মূলধনী ব্যবসায় মূলত সংরক্ষিত মূলধন, শেয়ার বিক্রয় ও ঋণ সংগ্রহের মাধ্যমে অর্থ বা তহবিল সংগ্রহ করে থাকে।

(খ) যৌথ মূলধনী কোম্পানির অর্থায়ন কার্যাবলী:

যে কোন প্রতিষ্ঠান গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কিছু মৌলিক কাজ সম্পন্ন করতে হয়। নিচে তার বর্ণনা করা হলো:

১) তহবিল সংগ্রহ : অর্থায়নের প্রথম ও প্রধান কাজ হচ্ছে সম্ভাব্য উৎস হতে প্রয়োজন অনুসারে অর্থ সংগ্রহ করা। কোন উৎস থেকে তহবিল সংগ্রহ করা হবে তা চিহ্নিত করার পর তহবিল সংগ্রহের জন্য বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। তুলনামূলক কম খরচ যুক্ত উৎস হতে তহবিল সংগ্রহ করতে হবে।কেননা মূলধন খরচ কম হলে ব্যবসায়ী মুনাফার পরিমাণ বেশি করার সুযোগ থাকে এবং ঝুঁকির পরিমাণ কম হবে।

২) মূলধন বাজেটিং সিদ্ধান্ত : প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য সম্ভাব্য উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের পর অর্থায়নের কাজ হচ্ছে সংগ্রহীত তহবিল বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করা। প্রকল্পের জন্য কি পরিমাণ মূলধন এর প্রয়োজন প্রকল্পের ব্যাক্তি এবং প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত আই এর পরিমাণ ইত্যাদি বিবেচনা করে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

৩) স্বল্পমেয়াদি সম্পদের ব্যবস্থাপনা : একটি প্রতিষ্ঠান স্বল্পমেয়াদে মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রয়োজন হয়।ব্যবসায়ের দৈনন্দিন কাজ নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে সম্পন্নের জন্য পর্যাপ্ত চলতি মূলধনের প্রয়োজন হয়।তাছাড়া ব্যবসায় মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি সুনাম বজায় রাখার জন্য চলতি মূলধনের প্রয়োজন পড়ে। ব্যবসায়ী নগদ অর্থ থাকলে দায় পরিশোধের অক্ষমতা সংক্রান্ত ঝুঁকি তথা আর্থিক ঝুঁকি ও পরিচালনা ঝুঁকির সম্মুখীন হতে হয় না। এর ফলে প্রতিষ্ঠান মুনাফা অর্জন ক্ষমতা বজায় থাকে।পর্যাপ্ত নগদ অর্থ সংরক্ষন, কাঁচামাল সংগ্রহ ইত্যাদি চলতি সম্পদ ব্যবস্থাপনার অন্তর্ভুক্ত।

৪) তহবিল বন্টন : সবচেয়ে মূলধন খরচ কম এমন উৎস থেকে তহবিল সংগ্রহ করার পর উক্ত তহবিল যথাযথভাবে বন্টন করার পদক্ষেপ নিতে হয়। কোন প্রকল্পে বিনিয়োগ করলে অধিক মুনাফা অর্জন সম্ভব চিহ্নিত করা অর্থায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। অর্জিত মুনাফা থেকে শেয়ারহোল্ডারদের পর্যাপ্ত লভ্যাংশ, পাওনাদারদের সুদ, সরকারকে কর প্রদান করতে হয়।

সুতরাং প্রতিষ্ঠানের অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য, সফলতা আনয়নের জন্য উল্লেখিত কার্যাবলী সম্পন্ন করতে হয়।

(গ) যৌথ মূলধনী কোম্পানির অর্থায়নের নীতিসমূহ :

১) তারল্য ও মুনাফা নীতি : এই নীতির মূল উদ্দেশ্য তারল্য ও মুনাফার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। তারল্য ও মুনাফা নীতি অনুসারে তারল্য ও মুনাফার মধ্যে ঋণাত্মক বা বিপরীতমুখী সম্পর্ক বিদ্যমান। অর্থাৎ তারল্য যত কম, মুনাফার পরিমাণ তত বেশি আবার তারল্যের পরিমাণ যত বেশি হবে মুনাফার পরিমাণ তত কম।

২) ঝুঁকি ও মুনাফা নীতি : এই নীতির মূল উদ্দেশ্য ঝুঁকি ও মুনাফার মধ্যে সমমুখী সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা। ঝুঁকি ও মুনাফার নীতির আলোচ্য বিষয় হল ঝুঁকি ও মুনাফার মধ্যে ধনাত্মক বা সম্পর্ক বিদ্যমান। ঝুঁকি যত বেশি হবে মুনাফা তত বেশি হবে, অন্যদিকে ঝুঁকি যত কম মুনাফা তত কম।

৩) পোর্টফোলিও বৈচিত্রায়ন নীতি : একটি প্রকল্পে বিনিয়োগ না করে একাধিক প্রকল্পে বিনিয়োগ করাই হল পোর্টফোলিও‌। পোর্টফোলিও বৈচিত্রায়ন নীতি হল ঝুঁকি সর্বনিম্নকরনের করার উদ্দেশ্যে একাধিক প্রকল্পে বিনিয়োগ করার নীতি। এই নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো ঝুঁকি সর্বনিম্ন করা।

(ঘ) যৌথ মূলধনী ব্যবসায়ের অর্থায়নের লক্ষ্যসমূহ:

১) মুনাফা সর্বোচ্চকরণ : মুনাফা সর্বোচ্চকরণ ব্যবসায়ের স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্য। মুনাফা সর্বোচ্চকরণ বলতে কোন ফার্ম বা ব্যবসায়ের মুনাফা বাড়ানো কে বোঝায়। মুনাফাকে আর্থিক দক্ষতার মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাধারণত বিক্রি বাড়িয়ে, খরচ কমিয়ে,চাহিদা সৃষ্টি করে, মূল্য বাড়িয়ে মুনাফা সর্বাধিকরণ করা হয়। এক্ষেত্রে শেয়ার প্রতি আয়কে মুনাফা সর্বোচ্চকরণের মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ মুনাফা সর্বাধিকরণ হলো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের শেয়ার প্রতি আয় সর্বাধিকরণ।

২) সম্পদ সর্বাধিকরণ:

সম্পদ সর্বাধিকরণ ব্যবসায়ের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য। আর্থিক কাজ ধারা প্রতিষ্ঠানের শেয়ার মূল্য বাড়লে তাকে সম্পদ সর্বাধিকরণ বলা হয়। শেয়ারহোল্ডারদের সম্পদ সর্বাধিকরণ প্রতিষ্ঠানের একটি উল্লেখযোগ্য লক্ষ্য‌। ফার্মের মালিকদের সম্পদের পরিমাণ নির্ণয় করা হয় শেয়ার এর বর্তমান বাজার মূল্য দ্বারা। প্রকৃতপক্ষে সম্পদ সর্বাধিকরণ এর বিপরীত ধারণা হলো মুনাফা সর্বাধিকরণ। সম্পদের সর্বাধিকরণের মাধ্যমে মুনাফা সর্বাধিকরণের সীমাবদ্ধতা দূর হয়।

সম্পদ = প্রতি শেয়ারের দাম × শেয়ারের সংখ্যা।

এক্ষেত্রে শেয়ারের মূল্য, লভ্যাংশ, ঝুঁকির পরিমাণ, নগদ প্রবাহ, অর্থের সময় মূল্য ইত্যাদি বিশ্লেষণ করা হয়।

সংক্ষেপে বলা যায় যৌথ মূলধনী ব্যবসায়ের এই দুটি লক্ষ্য মুনাফা সর্বাধিকরণ, সম্পদ সর্বাধিকরণের স্বার্থ ভিন্ন মুনাফা সর্বাধিকরণ এর ক্ষেত্রে শুধুমাত্র মালিকের স্বার্থ বিবেচনা করা হয় কিন্তু সম্পদ সর্বাধিকরণ এর ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের পাশাপাশি দেশ ও প্রতিষ্ঠানের অন্যান্যদের স্বার্থ বিবেচনা করা হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top