মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর মদিনা জীবনে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যা ও এর সমাধান সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন।

তারিখঃ ১৭-০৮-২০২১ ইং
বরাবর
অধ্যক্ষ
মালিকান্দা মেঘুলা স্কুল এন্ড কলেজ
দোহার , ঢাকা

বিষয়: মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর মদিনা জীবনে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যা ও এর সমাধান সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন।

মহোদয় , বিনীত নিবেদন এই যে, আপনার আদেশ নং মা.মে.স.ক.১৩৪-৮ তারিখঃ ১১-৮-২০২১ অনুসারে ” মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর মদিনা জীবনে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যা ও এর সমাধান সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন ” নিল্পে পেশ করছি।

“মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর মদিনা জীবনে ইসলামপ্রচারের ক্ষেত্র সৃষ্ট সমস্যা ও এর সমাধান”

মদিনা সনদ: মহানবী (সা.) প্রিয় জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করার পর সেখানে একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র স্থাপন করার পরিকল্পনা করেন। মহানবী (সা.) মদিনার সংহতির চিন্তা করে সেখানকার অধিবাসীদের নিয়ে তথা পৌত্তলিক , ইহুদি, খ্রিস্টান এবং মুসলিমদের মধ্যে এক লিখিত সনদ বা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। আর এ সনদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার ঘোষণা দেন। এ সনদকেই ‘ মদিনা সনদ’ বলা হয়। ইসলামের ইতিহাসে এ সনদের গুরুত্ব ‘ লীগ অব নেশন্স’ বা’ জাতিসংঘ ‘ ,’ চার্টার অব হিউম্যান রাইটস ‘ বা জেনেভা কনভেনশনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী ছিল।

মদিনা সনদের গুরুত্ব ও তাৎপর্য: আরবের ইতিহাসে শান্তি প্রতিষ্ঠার সুমহান উদ্দেশ্য নিয়ে অন্য কোনো ব্যক্তি বা নেতা এমন উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেননি। শাস্তি প্রতিষ্ঠার বাস্তব উদ্যোগের প্রেক্ষিতে মদিনা সনদ বিভিন্ন দিক দিয়ে বহু গুরুত্ব বহন করে। মহানবী (সা.) যে শুধু একজন ধর্মপ্রচারকই নন; বরং বিশ্ব ইতিহাসে একজন শ্রেষ্ঠ রাজনীতিক বিপ্লবী মহাপুরুষ ছিলেন , তাও এ সনদে প্রমাণিত হয়। মদিনায় শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে প্রণীত মদিনা সনদ পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান। এর পূর্বে এরুপ কোনো মৈত্রী সংবিধান ছিল না। এটি তৎকালীন যুগেই বরং সর্বযুগে সর্বকালের মহামানবের জন্য শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক। এঁতিহাসিক মুইর বলেন,” এ চুক্তি হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) – এর অসামান্য মাহাত্ম ও অপূর্ব ও মননশীলতার পরিচায়ক।”

ড. হামিদুল্লাহ বলেন, ” মোট ৪৭ টি ধারাবিশিষ্ট এ সনদ ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম লিখিত শাসনতনত্র। ভ্রাতুসংঘ ও এক্য প্রতিষ্ঠা ও মদিনা সনদ’ মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়কে ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করে হিংসাদ্বেষ ও কলহের অবসান করে এবং বিপদে সবাই একএ নীতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করে। মুসলিম ও অন্যদের সাথে সকল প্রকার পার্থক্য নিরসনে এর কার্যকারিতা ধারাগুলোর দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে যায়। রাজনৈতিক কয প্রতিষ্ঠা ও সে সময় আরবের মানুষদের মধ্যে কোনো রাজনৈতিক এঁক্য ছিল না। রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় | হিজরতের পর জাতি – ধর্ম নির্বিশেষে রক্তের ভিত্তির স্থলে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে মদিনাবাসীর মধ্যে রাজনৈতিক এঁক্য স্থাপিত হয়।

একমাত্র রাসূলুল্লাহ (সা.) – এর প্রণীত মদিনা সনদই মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে সবার ভ্রাতৃত্বপূর্ণ &ক্য প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখে। ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও উদারতা ও হযরত মুহাম্মদ (সা.) ধমীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌম, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের উজ্জল দৃষ্টান্ত। তাঁর প্রণীত মদিনা সনদ মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। মদিনার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকেরা পরস্পরের ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।” – এ শর্ত দ্বারা হযরত মুহাম্মদ (সা.) যে মহানুভবতা ও ধর্মীয় সহিষুতার পরিচয় দেন তা বিশ্বের ইতিহাসে সত্যিই বিরল।

বদর ও উহুদের যুদ্ধের ফলাফল:

বদর যুদ্ধের ফলাফল: বদর যুদ্ধ ইসলামের সর্বপ্রথম যুদ্ধ এবং অবিস্মরণীয় এক ঘটনা। মুসলিম শক্তি এ যুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্ব জয়ের সোপানে আরোহণ করে। এ যুদ্ধে কুরাইশ শক্তিকে পর্যুদস্ত করে মুসলিমরা প্রথম বারের মতো বিশ্বময়। ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ। এ যুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ইসলামের প্রচার প্রসারের দিগন্ত উন্মোচিত হয়। বদর যুদ্ধে বিজয়ের ফলে মুসলিমদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অজিত হয়। মুসলিমগণ প্রচুর গনীমত লাভ করে। এতে
ইসলামী রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত হয়।

উহুদ যুদ্ধের ফলাফল: উহুদ যুদ্ধ মুসলিমদের জন্য ছিল ধৈর্যের অগ্নি পরীক্ষা। একথা সত্য, নিরবচ্ছিন্ন বিজয় কোনো জাতির ভাগ্যেই জুটে না। বিজয়ের আনন্দ ও পরাজয়ের গ্লানি সঙ্গী করেই বৃহত্তর সাফল্যের পথে এগিয়ে যেতে হয়। এজন্য প্রয়োজন ধৈর্যের। এ পরীক্ষায় মুসলিমগণ ধৈর্য ও সাহসিকতার সাথে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।

ঈমানের দৃঢ়তা ও যুদ্ধোত্তরকালে আল্লাহ তায়ালা সূরা আলে ইমরানে মুসলিমদের খাঁটি মুমিন হতে এবং হকের ওপর দৃঢপদ থাকতে নির্দেশ প্রদান করেন। এ যুদ্ধের ফলে। মুসলিমদের ঈমান আরো বৃদ্ধি পেতে থাকে। সেদিন যুদ্ধের প্রথম দিক জয় লাভ করেও পরবর্তীতে তাদের পরাজয় মেনে নিতে হয়েছিল। তাই পরবর্তী যত যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল সেগুলোতে তারা মহানবী সা.) – এর আদেশ নির্দেশ পুরোপুরি মেনেই যুদ্ধ করেছিলেন। ফলে বলা যেতে পারে, উহুদ যুদ্ধ মুসলিমদের জন্য ঈমানী পরীক্ষা হিসেবে কাজ করেছিল।

ইহুদিদের মদিনা সনদের শর্ত ভঙ্গের শাস্তি ও ৯তিহাসিক পি.কে.হিটি বলেন, ইহুদি বনু নযির ও বনু কায়নুকা গোত্র মদিনা সনদের শর্ত ভঙ্গ করে কুরাইশদের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার অপরাধে মদিনা থেকে বহিদ্ধতি হয়। জয় পরাজয়ের অভিজ্ঞতা ও উহুদ।

রাণাঙ্গনে প্রাথমিকভাবে মুসলিমদের বিজয় এবং সে কারণে উল্লাস ও বিশৃগ্রলাই। পরবর্তীতে পরাজয়ে পর্যবসিত হয়। অপরদিকে কুরাইশরা আপাত জয়লাভ করলেও এর | কোনো সুফল ভোগ করতে পারেনি; বরং নৈতিক দুর্বলতাহেতু মনোবল হারিয়ে ময়দান ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। মুসলিমদের বীরন্ব বৃদ্ধি ও উহুদের পরাজয় মুসলিমদের বীরত্ব অধিকতর বৃদ্ধি করেছিল।

হুদায়বিয়ার সন্ধির গুরুত্ব: হুদায়বিয়ার সন্ধির তাৎপর্য আলোচনা করলে প্রতীয়মান হবে এতে বিধর্মী ও মুসলিমদের মধ্যে অন্ততপক্ষে দশ বছরের জন্য নিরবচ্ছিন্ন শান্তি রক্ষার প্রচেষ্টা করা হয়। যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাবে কুরাইশ ও হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর সদিচ্ছা প্রকাশ পায়। কারণ কুরাইশরাও যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। এ সন্ধির ফলে আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর মহানুভবতা ও দূরদর্শিতার প্রতি আকৃষ্ট হয়। এতে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পেতে থাকে ।

মক্কা বিজয় ও শান্তি নীতি: রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কা অভিযানের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। অষ্টম হিজরী সনের ১৮ রমযান রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রায় দশ হাজার অনুরক্ত ভক্ত সাথে নিয়ে মক্কা অভিমুখে যাত্রা করেন। আরবদের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (সা.) সেনাবাহিনীকে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে আগুন জ্বালাবার নির্দেশ দেন, তাতে সমগ্র মরুভূমি ঝলমল করে ওঠে। কুরাইশ প্রধানগণ এ দৃশ্য দেখে প্রকৃত তথ্য সংগ্রহের জন্য হাকিম বিন হিযাম , আবু সুফিয়ান ও বুদায়লকে পাঠায়। তবু প্রহরারত মুসলিম সৈন্যরা আবু সুফিয়ানকে ধরে ফেললেন। তাকে বন্দি করা হয়। পরে আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণ করেন।

তারপর মহানবী (সা.) আবু সুফিয়ানকে বললেন- আবু সুফিয়ান, তুমি গিয়ে মক্কাবাসীদের অভয় দাও আজ তাদের প্রতি কোনোই কঠোরতা করা হবে না। তুমি আমার পক্ষে নগরময় ঘোষণা করে দাও

  1. যারা আত্মসমর্পণ করবে
  2. যারা কাবায় প্রবেশ করবে
  3. যারা নিজেদের গৃহদ্ধার বন্ধ করে রাখবে, অথবা
  4. যারা আবু সুফিয়ানের গৃহে প্রবেশ করবে, তাদের অভয় দেয়া হলো।

মক্কায় পৌছে রাসূলুল্লাহ হনুজ নামক স্থানে ঝাণ্ডা উড্ডীন করতে এবং সৈন্যদের নিয়ে হযরত খালিদ (রা) কে উচ্চভূমির দিকে অগ্রসর হওয়ার আদেশ করেন। মহানবী (সা.) মুসলিম বাহিনীর উদ্দেশ্যে বলেন, যতক্ষণ কেউ তোমাদের সাথে লড়াই না করবে, তোমরাও লড়াই করবে না।

কুরাইশদের থেকে ইকরামা ও সাফওয়ান তীর নিক্ষেপ আরন্ত করে। এতে কুরয ইবনে জাবির ফিহরী ও কুনায়স ইবনে খালিদ ইবনে রবিয়া শহীদ হন। হযরত খালিদ প্রতিশোধ গ্রহণ আরন্ত করলে যুদ্ধ বেঁধে যায়। এতে ৭০ জন কাফিরকে হত্যা করে ফেলেন।

বায়তুল্লায় প্রবেশ ও সালাত আদায়: রাসূলুল্লাহ (সা.) আনসার ও মুহাজিরদের নিয়ে মসজিদে হারাম বায়তুল্লায় প্রবেশ করলেন। ভক্তিভরে তার চারপার্থে তাওয়াফ করলেন ও হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করলেন। হযরত উমর ও আলী (রা:) কে বায়তুল্লাহ হতে ৩৬০ টি মূর্তি অপসারণ করে কাবাঘর পবিত্র করতে আদেশ দিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)।

কাবাঘরে প্রবেশ করে দু’রাকাত সালাত আদায় করলেন ও তাকবিরের ধনিতে বায়তুল্লাহ মুখরিত হল। অতঃপর তিনি কাবাঘরের দরজা খুললেন | এইভাবে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা বিজয় করলেন এবং শান্তি নীতি স্থাপন করলেন মক্কাতে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top