“ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ” শীর্ষক প্রবন্ধ

ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ শীর্ষক প্রবন্ধ।

বিষয়বস্তু

  • ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে পারবে
  • একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার স্বীকৃতির প্রেক্ষাপট এবং এর মর্যাদা বর্ণনা করতে পারবে
  • ভাষা আন্দোলনের প্রতি সম্মান প্রদর্শণের মাধ্যমে ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে আগ্রহী হবে

নির্দেশনা

  • ক. ভাষা আন্দোলনের পটভূমি বর্ণনা
  • খ. ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু, অন্যান্য নেতৃত্ব এবং নারীদের ভূমিকা নিরূপণ
  • গ. বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ এবং পূর্ববাংলার স্বাধিকার আন্দোলনে (৫২ – ৭১) ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য বিশ্লেষণ
  • ঘ. আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি অর্জন (পটভূমি ও তাৎপর্য

ভাষা আন্দোলনের পটভূমিঃ

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়। ভাষা, নৃতত্ত্ব, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভৌগোলিক পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাসসহ সকল ক্ষেত্রে বিস্তর ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও কেবল ধর্মের ভিত্তিতে এক হাজার মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত করে এই অসম রাষ্ট্র গড়ে তোলা হয়। এই রাষ্ট্রের কর্ণধাররা প্রথমই শোষণ ও বৈষম্যের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয় বাঙালির প্রাণের ভাষা বাংলাকে।

অথচ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় পাকিস্তানের ভাষাগত জনসংখ্যার একটি পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় যে, মোট জনসংখ্যার ৫৪.৬০% বাংলা, ২৮.০৪% পাঞ্জাবি, ৫.৮% সিন্ধি, ৭.১% পশতু, ৭.২% উর্দু এবং বাকি অন্যান্য ভাষাভাষী নাগরিক।

ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ শীর্ষক প্রবন্ধ

এর থেকে দেখা যায় উর্দু ছিল পাকিস্তানি ভাষাভাষির দিক থেকে ৩য় স্থানে। অন্যদিকে তদানীন্তন পূর্ববঙ্গের জনসংখ্যার ৪.৪০ কোটির মধ্যে ৪.১৩ কোটি ছিল বাংলা ভাষাভাষী। এখানে ৯৮% বাংলা এবং মাত্র ১.১% ছিল উর্দু ভাষী।

অথচ বাংলা ভাষাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বেশ কিছু পরিকল্পনা নেয়। কিন্তু সংগ্রামের ঐতিহ্যে লালিত বাঙালি জাতি মাতৃভাষার ওপর এ আঘাতের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। পাকিস্তান সৃষ্টির ছমাস পেরুতে না পেরুতে তারা বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য রাজপথে নামে যা ১৯৫২ সালে দ্বিতীয় পর্বের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে সাফল্য লাভ করে।

ক. উর্দু বনাম বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে উদ্দেশ্য ও যুক্তি

পাকিস্তানের মতো বহু ভাষাভাষী রাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে ঐক্য বন্ধন সৃষ্টির জন্য একটি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রয়োজনীয়তা প্রথম থেকেই শাসকগোষ্ঠী অনুভব করেন। পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আমলা থেকে শুরু করে প্রভাবশালীদের বড় অংশ ছিলেন উত্তর ভারত থেকে আগত উর্দুভাষী। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, লিয়াকত আলী খান থেকে শুরু করে পাকিস্তানের উচ্চ পদবীধারীরা ছিলেন উর্দুভাষী মোহাজের। জিন্নাহ ও তাঁর উত্তরসূরি লিয়াকত আলীর মন্ত্রিসভাকে তাই ‘মোহাজের মন্ত্রিসভা’ বলা হতো।

এক হিসেবে দেখা যায় ১৯৪৭-৫৮ পর্যন্ত পাকিস্তানের মোট ২৭ জন গভর্নর জেনারেল/প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, প্রাদেশিক গভর্নর ও মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যে ১৮ জন ছিলেন মোহাজের। এদের আবার অধিকাংশের ভাষা ছিল উর্দু। যে কারণে প্রথমে থেকেই শ্রেণী স্বার্থে তাঁরা উর্দু ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ছিলেন। এমন কি নাজিমুদ্দিন যিনি পূর্ববাংলার উচ্চপদে আসীন হয়েছিলেন তিনি ছিলেন উর্দুভাষী। স্বভাবতই তারা ও পশ্চিম পাকিস্তানি জনগোষ্ঠী রাজনীতি, অর্থনীতিসহ সর্বত্র নিজেদের প্রাধান্য বজায় রাখার জন্য এ ভাষাকে বেছে নেয়। পশ্চিম পাকিস্তানিরা বহুদিন থেকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে উর্দুকে চর্চা করায় তারা উর্দুর বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ করেনি। মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ও প্রভাবশালী অংশ পশ্চিম পাকিস্তানি হওয়ায় তারা সকলে এ ভাষার পক্ষে ছিলেন।

ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ শীর্ষক প্রবন্ধ

তবে পূর্ববাংলায় এর প্রতিবাদ ওঠে। কারণ পূর্ববাংলায় কখনোই উর্দু চর্চা হয়নি। বাঙালিরা গণতন্ত্র, জনসংখ্যাধিক্য ইত্যাদি কারণে ৫৬% বাংলাভাষীদের ভাষা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা দাবি করেছে। এর সাথে জড়িত ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ। সব যুক্তি উপেক্ষা করে প্রশাসন, অর্থনীতির কেন্দ্রসহ পশ্চিম পাকিস্তান ও কেন্দ্রের রাজধানী স্থাপিত হয় করাচিতে মুসলিম লীগের প্রভাবশালী অংশের সেখানে অবস্থানের ফলে স্বাভাবিকভাবে পশ্চিম পাকিস্তান সমৃদ্ধ এলাকা এবং পূর্ববঙ্গ অবহেলিত এলাকায় পরিণত হয়।

বৈদেশিক ঋণের সিংহভাগের ব্যবহার, উন্নয়ন কর্মকান্ডের বড় অংশ পশ্চিমে সম্পাদনের ফলে বঞ্চিত পূর্ববঙ্গবাসীদের বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে পাকিস্তান সৃষ্টির ফলে শুধু শাসকের বদল হয়েছে। ব্রিটিশ শোষণের বদলে পাকিস্তানি শোষকের আবির্ভাব হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাজনীতি, প্রশাসনসহ চাকরি ও পদের ক্ষেত্রে বাঙালিদের বঞ্চিত করার নীতি।

উর্দুকে সরকারি ভাষা ঘোষণা, গণমাধ্যমে ব্যাপক উর্দুর ব্যবহার, সরকারি কর্মকান্ডে যেমন মানি অর্ডার ফর্ম, টেলিগ্রাম ফর্ম, ডাকটিকেট, মুদ্রায় উর্দু ব্যবহার শুরু এবং সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উর্দু ভাষা ব্যবহারের নির্দেশ দেয়া হলে শিক্ষিত বাঙালিরা এর প্রতিবাদ জানায়। প্রথম থেকেই তাই বাঙালি ছাত্র ও নেতৃবৃন্দের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা, দাবি দাওয়াতে বাংলা ভাষাকেও সরকারি মর্যাদা দানের দাবি তোলা হয়। এভাবে বাংলা ভাষার দাবি পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়।

খ. ভাষা বিতর্কের উৎপত্তি ও বিকাশ

পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই উর্দু বনাম বাংলা নিয়ে ভাষা বিতর্ক দেখা দেয়। ১৯০৬ সালে যখন নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলিম লীগের এ অধিবেশনেও এ প্রশ্ন ওঠে। তবে তখন পর্যন্ত এ সমস্যাটি তত প্রকট হয়নি। ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগ সভাপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে দলের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে প্রবর্তনের একটি উদ্যোগ নিলে ফজলুল হকের বিরোধিতায় তা সফল হয়নি। তৎকালীন বাংলা সরকারের সময়ও ভাষা নিয়ে তেমন সমস্যা হয়নি। ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের প্রাক্কালে এই বিতর্ক মৃদুভাবে দেখা দেয়।

কংগ্রেস নেতারা হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দিলে পাল্টা ভারতের মুসলিম নেতৃবৃন্দ উর্দু ভাষাকে সমগ্র ভারতের রাষ্ট্রভাষা দাবি করেন। এ প্রসঙ্গে খুব ক্ষুদ্র হলেও বাংলার পক্ষে দাবি ওঠে। তবে ১৯৪৭ সালে যখন পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায় তখন ভাষা বিতর্ক নতুন রূপ নেয়। ১৯৪৭ সালের ১৭ মে মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা চৌধুরী খালিকুজ্জামান এবং জুলাই মাসে আলিগড় বিশ্ববদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বক্তব্য দেন।


ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ শীর্ষক প্রবন্ধ

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছাড়াও বেশ কয়েকজন বাঙালি লেখক, বুদ্ধিজীবী এর প্রতিবাদ করেন এবং বাংলার পক্ষে বক্তব্য দেন। পূর্ববঙ্গের ছাত্র ও শিক্ষিত সমাজ রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে পত্র-পত্রিকায় মতামত প্রকাশ করতে শুরু করেন। এসময় পূর্ববঙ্গে গঠিত বিভিন্ন সংগঠনও এ বিষয়ে ভূমিকা রাখে।

জুলাই মাসেই কামরুদ্দীন আহমদকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয় ‘গণআজাদী লীগ’ নামে একটি আদর্শভিত্তিক সংগঠন। এই সংগঠন স্পষ্টভাবে বাংলাকে পূর্ববঙ্গের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি করে। পরের মাসে পাকিস্তান সৃষ্টির পর ভাষা বিতর্ক আরো প্রকাশ্য রূপ লাভ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে গঠিত ‘তমদ্দুন মজলিস’ সভাসমিতি ও লেখনীর মাধ্যমে বাংলা ভাষার পক্ষে জনমত গড়ে তোলে। এই সংগঠনের উদ্যোগে ডিসেম্বর মাসে গঠিত হয় ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ যার আহ্বায়ক মনোনীত হন নূরুল হক ভূঁইয়া।

পরবর্তীকালে এ উদ্দেশ্যে কয়েকটি কমিটি গঠিত হলেও প্রাথমিক পর্যায়ে তমদ্দুন মজলিসের গঠিত প্রথম সংগ্রাম পরিষদটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগ, পূর্ববঙ্গের বুদ্ধিজীবী সমাজ, সাংবাদিক সংঘ বিভিন্ন সভা ও স্মারকলিপির মাধ্যমে বাংলাকে পূর্ববঙ্গের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান।

ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ শীর্ষক প্রবন্ধ

তবে পূর্ববঙ্গের জনগণের দাবি ও আশা-আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে ডিসেম্বরের প্রথম দিকে করাচিতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। সরকারি কোন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এই প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়। ঢাকার বাইরেও এ আন্দোলন প্রসার ঘটে। ঢাকায় ৬ ডিসেম্বর প্রতিবাদ মিছিল শেষে বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের দাবি-দাওয়া পেশ করেন। যদিও এ পর্যায়ে সরকার যড়যন্ত্রের পাশাপশি উর্দুভাষী মোহাজেরদের বাংলা ভাষার পক্ষে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়।

১২ ডিসেম্বর এমনি একটি বাঙালি-অবাঙালি সংঘর্ষে বেশ কযেকজন বাঙালি ছাত্র আহত হন। ভাষা সৈনিক নূরুল হক ভূঁইয়া এ ঘটনার গুরুত্ব সম্পর্কে বলেন, “বাঙালিদের উপর অবাঙালিদের এটা যে অন্যায় হামলা ছিল তা সবার কাছে বেশ পরিষ্কার হয়। বাঙালির মাঝে নিজেদের অস্তিত্ব, জাতীয় সত্তা ইত্যাদি সম্পর্কে সচেতনতা লক্ষ্য করা যায়। এর ফলে ভাষা আন্দোলন দ্রুত জনসমর্থন লাভ করে। এই ঘটনার প্রতিবাদে ১৩ ডিসেম্বর সচিবালয়ের কর্মচারীরা ধর্মঘট পালন করে। সরকার ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে এবং ১৫ দিনের জন্যে সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

গ. ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের বিস্তার

উল্লেখিত পরিস্থিতিতে ১৯৪৮ সালের প্রথম থেকেই ভাষা প্রশ্নে বাঙালি জনগোষ্ঠীর শিক্ষিত অংশ বাংলা ভাষার পক্ষে সোচ্চার হয়। ১৯৪৮ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এক অধিবেশনে নিম্নপর্যায় থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলাকে গ্রহণের প্রস্তাব গ্রহণ করে। ২৩ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদের অধিবেশনে কংগ্রেস দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দু ও ইংরেজির সঙ্গে বাংলাকেও গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে ব্যবহারের দাবি উত্থাপন করেন। কিন্তু মুসলিম লীগের সকল সদস্যের ভোটে তা অগ্রাহ্য হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পূর্ববঙ্গে ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। এর প্রতিবাদ করে প্রথমে ছাত্র সমাজ।

২৬ ও ২৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। ২ মার্চ ছাত্রসমাজ দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের উপস্থিতিতে দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে। এ পরিষদের আহ্বায়ক মনোনীত হন শামসুল আলম। নব গঠিত পরিষদ ১১ মার্চ হরতাল আহ্বান করে। ঐদিন হরতালকালে পুলিশের লাঠি চার্জে অনেকে আহত হন। শেখ মুজিব, শামসুল আলম সহ ৬৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে ১৩-১৫ মার্চ ঢাকার সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। শুধু ঢাকা নয় ঢাকার বাইরে সর্বত্র ১১ মার্চ হরতাল ও অন্যান্য দিনের কর্মসূচি পালিত হয়। আন্দোলনের তীব্রতার প্রেক্ষিতে ১৫ মার্চ মুখ্যমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে ৮ দফা চুক্তিতে গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি, তদন্ত কমিটি গঠন, শিক্ষার মাধ্যম বাংলা ও ব্যবস্থাপক সভায় রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত বিষয় উত্থাপনে রাজি হন।

ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ শীর্ষক প্রবন্ধ

তড়িঘড়ি করে তাঁর চুক্তি সম্পাদনের মূল উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল জিন্নাহর আসন্ন ঢাকা সফর যেন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। ১৯ মার্চ জিন্নাহও ঢাকা সফরে এসে ২১ মার্চ রেসকোর্সে নাগরিক সংবর্ধনা, ২৪ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে বৈঠক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের সরকারি ভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে মতামত দেন।


জিন্নাহর ২৪ মার্চ বক্তৃতার তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করে উপস্থিত ছাত্ররা ‘না’ ‘না’ ধ্বনি উচ্চারণ করেন। কিন্তু ১৯৪৮ সালের ৬ এপ্রিল পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক পরিষদের অধিবেশনে নাজিমুদ্দিন সংগ্রাম পরিষদের সাথে ১৫ মার্চের চুক্তি ভঙ্গ করে উর্দুকে পূর্ববঙ্গের সরকারি ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম করার প্রস্তাব করেন। পরিষদে বিরোধী দল এর প্রতিবাদ করলেও নাজিমুদ্দিন তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাহার করেন নি। যদিও শেষপর্যন্ত পরিষদে উত্থাপিত এই প্রস্তাবটিও বাস্তবায়ন হয়নি।

১৯৪৮ সাল জিন্নাহর মৃত্যুর পর বিশেষত মার্চ মাসের পর হতে ভাষা আন্দোলন কিছু দিনের জন্য স্তিমিত থাকলেও বাংলার অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের আন্দোলন সংগঠিত হয়। বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায়ের লক্ষে ৮ এপ্রিল থেকে ১৮ দিন কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারীদের ধর্মঘট, মেডিকেল ছাত্রদের ধর্মঘট, জুন মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন চলে।

১৪ জুলাই পুলিশ ধর্মঘট হয়। সেনাবাহিনী ও পুলিশের মধ্যে গুলি চলাকালে ২ জন পুলিশ নিহত হয়। এই অবস্থায় ১৯৪৮ সালের ১৮ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত খান আলী ঢাকা এলে ছাত্র সমাজ বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবি জানায়। লিয়াকত আলী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া বক্তৃতায় সুকৌশলে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে ছাত্রদের মধ্য হতে আবারও ‘না’ ‘না’ ধ্বনি সম্বলিত প্রতিবাদ ওঠে।

ঘ. ১৯৪৯-১৯৫২ সাল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনের বিস্তার

১৯৪৮ সালের পর প্রতি বছর ১১ মার্চ প্রতিবাদ দিবস হিসেবে পালন করা হতো। ১৯৪৯ সালে আরবি হরফে বাংলা লেখার সরকারি ষড়যন্ত্র শুরু হয়। এ উদ্দেশে ১৯৪৯ সালের মার্চে আকরাম খাঁকে সভাপতি করে ‘পূর্ববাংলা ভাষা কমিটি গঠিত হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রতিবাদ জানায়। যদিও শেষপর্যন্ত এর বাস্তবায়ন হয়নি। ১৯৫২ সালে নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হয়ে ২৭ জানুয়ারি উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন। এর প্রতিবাদে ছাত্র সমাজ ৩০ জানুয়ারি ধর্মঘট পালন করে।

৩১ জানুয়ারি সর্বদলীয় সভায়ও সরকারি নীতির সমালোচনা করা হয়। এ সময় আব্দুল মতিনকে আহবায়ক করে নতুন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এই পরিষদ গঠনের পর আন্দোলনের গতি সঞ্চার করে। নাজিমুদ্দিনের এই উক্তির প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ৩০ জানুয়ারি মাওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে এক সভায় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এ পরিষদই ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ববঙ্গে হরতাল আহ্বান করে। কিন্তু সরকার বিক্ষোভ দমনে ১৪৪ ধারা জারি করলে শুরু হয় ভাষা আন্দোলনের দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত পর্ব।

ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু, অন্যান্য নেতৃত্ব এবং নারীদের ভূমিকা

ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু

আন্দোলনের প্রাথমিক স্তরে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিত ছাত্রসমাজের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ ও সাধারণ ধর্মঘট চলাকালে পুলিশি আক্রমণে বহু ছাত্র আহত হন এবং শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, শামসুল হক, শওকত আলী ও গোলাম মাহবুবসহ বিপুলসংখ্যক ছাত্রনেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের কারণে বিক্ষোভ প্রশমিত না হয়ে তীব্র হয়ে ওঠে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে ভাষা আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নিলেও প্রকৃতপক্ষে এ আন্দোলনের বীজ রোপিত হয় আরও আগে। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। যেখানে কথা বলার সুযোগ রাখা হয় কেবল উর্দু এবং ইংরেজিতে।

ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ শীর্ষক প্রবন্ধ

তৎকালীন পাকিস্তানের পূর্ব বাংলার কুমিল্লা থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দু এবং ইংরেজির সঙ্গে বাংলা ভাষাকে গণপরিষদের অন্যতম ভাষারূপে সরকারি স্বীকৃতির দাবি তোলেন। যা ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য একটি শান্তিময় প্রস্তাব।

কিন্তু তার এ যৌক্তিক দাবির সরাসরি বিরোধিতা করলেন তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান, পূর্ব বাংলার মুসলিম লীগ প্রতিনিধি প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন, গণপরিষদের সহসভাপতি মৌলবি তমিজউদ্দিন খান প্রমুখ। তারা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণের অভিপ্রায় ব্যক্ত করলেন। ভাষা নিয়ে মুসলিম লীগ নেতাদের ষড়যন্ত্র, প্রতিবাদ, আন্দোলন-সংগঠন এবং এতে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তসহ নিজের ভূমিকার প্রেক্ষাপট প্রাঞ্জল ভাষায় বর্ণনা করেন শেখ মুজিবুর রহমান তার লেখনীতে-

“এই সময় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ তমদ্দুন মজলিশ যুক্তভাবে সর্বদলীয় সভা আহ্বান করে একটা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করলো। তমদ্দুন মজলিশ একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান যার নেতা ছিলেন অধ্যাপক আবুল কাসেম সাহেব। এদিকে পুরানা লীগ কর্মীদের পক্ষ থেকে জনাব কামরুদ্দিন সাহেব, শামসুল হক সাহেব অনেকেই সংগ্রাম পরিষদে যোগদান করলেন। সভায় ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চকে বাংলা ভাষা দাবি দিবস ঘোষণা করা হলো। জেলায় জেলায় আমরা বের হয়ে পড়লাম।”

‘সিক্রেট ডক্যুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দি নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে ড. শামসুজ্জামান খান লিখেছেন-

ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ শীর্ষক প্রবন্ধ

“৪ মার্চ ১৯৪৮ সাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম স্টুডেন্ট লীগের অস্থায়ী সাংগঠনিক কমিটির পক্ষে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি সংবলিত এক লিফলেটে স্বাক্ষর করেন। এবং ১১ মার্চ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে এবং সচিবালয়ে ছাত্র বিক্ষোভে নেতৃত্বে দিয়ে তিনিসহ কয়েক ছাত্র গ্রেপ্তার হন।”
এ সম্পর্কে গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ১৬-৩-৪৮-এ গোপালগঞ্জে সর্বাত্মক হরতাল ডাকা হয়। বিকেলে এস এন একাডেমি এবং এম এন ইন্সটিউটের ৪০০ ছাত্র শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করে, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘নাজিমউদ্দিন নিপাত যাক’ ‘মুজিবকে মুক্তি দাও’, ‘অন্য গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি দাও’ ইত্যাদি স্লোগান দেয়।

এখানে উল্লেখ্য ঢাকায় এর আগের দিন শেখ মুজিবুর রহমানসহ গ্রেপ্তারকৃত নেতাদের মুক্তি দেয়া হয়। সে খবর যথাসময়ে গোপালগঞ্জে না পৌঁছানোয় ছাত্র বিক্ষোভটি ওই দিন অনুষ্ঠিত হয়। এদিকে আন্দোলনের প্রাথমিক স্তরে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিত ছাত্রসমাজের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ ও সাধারণ ধর্মঘট চলাকালে পুলিশি আক্রমণে বহু ছাত্র আহত হন এবং শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, শামসুল হক, শওকত আলী ও গোলাম মাহবুবসহ বিপুলসংখ্যক ছাত্রনেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের কারণে বিক্ষোভ প্রশমিত না হয়ে তীব্র হয়ে ওঠে। এভাবে ভাষা আন্দোলনে ক্রমান্বয়ে চরম আকার ধারণ করার দিকে অগ্রসর হতে থাকে পূর্ব বাংলাজুড়ে।

ভাষা আন্দোলনে অন্যান্য নেতৃত্ব

তথ্যমতে, বাংলা ভাষা আন্দোলন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার উপক্রম হলে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার সমঝোতার উপায় খুঁজতে থাকে। ফলে সরকারের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ও সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে কামরুদ্দিন আহমদ একটি চুক্তিতে উপনীত হন। ১৫ মার্চ সই করা চুক্তিতে গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি, পুলিশি নির্যাতনের তদন্ত, সংবাদপত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার ছাড়াও বাংলা ভাষার মর্যাদা সম্পর্কে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

চুক্তিটি সই হওয়ার আগে গুরুত্বপূর্ণ ছাত্রনেতাদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কিন্তু তাদের বেশির ভাগই তখন জেলে। এ অবস্থায় চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার আগে সংগ্রাম পরিষদের সদস্যরা ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে গিয়ে শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, শওকত আলী প্রমুখ বন্দি ছাত্রনেতাদেরকে চুক্তিপত্রটি দেখিয়ে তাদের সম্মতি গ্রহণ করেন বলে জানা যায়। প্রসঙ্গত, ওই চুক্তি সইয়ের মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে চুক্তির অসারতা প্রমাণ হয় বলে জানা যায়। ২১ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ‘একমাত্র উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা’ করার ঘোষণা দেন রেসকোর্স ময়দানে। ভাষার অধিকার নিয়ে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ জোরদার হলে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে নূরুল আমিন সরকার।

বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে আন্দোলনকে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে রূপ দেয়ার চেষ্টা চালান। ওই দিন (২১ ফেব্রুয়ারি) ছাত্রদের খণ্ড খণ্ড মিছিলে পুলিশ বেপরোয়া লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগ করে। ফলে ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের খণ্ড যুদ্ধ শুরু হলে বহু ছাত্র-জনতা আহত হয়।

ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ শীর্ষক প্রবন্ধ

একপর্যায়ে ছাত্ররা প্রতিবাদ জানানোর জন্য পরিষদ ভবনের দিকে যাওয়ার সময় মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলের কাছে পুলিশ গুলি চালালে রফিক উদ্দিন, জব্বার ও আবুল বরকত শহিদ হন। এই ঘটনার পর একদিকে ছাত্র-জনতার আন্দোলন ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠে, অপরদিকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাদের এদেশীয় তোষামোদকারী গোষ্ঠীর যোগসাজশে প্রাসাদ যড়যন্ত্র অব্যাহত রাখে।

এখানে উল্লেখ্য তৎকালীন ছাত্র ও যুবনেতা শেখ মুজিবুর রহমান ভাষা আন্দোলনে তার সক্রিয় ভূমিকার কারণে ’৪৮ সালের ১১ মার্চ গ্রেপ্তার হন, ১৫ মার্চ চুক্তি সম্পাদনের পর মুক্তি পেলেও ’৪৯ সালের ১২ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনের সময় তাদের পক্ষে মিছিলে নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগে পুনরায় গ্রেপ্তার হন। কিছুদিন পর মুক্তি পেয়ে ’৫০ সালে দুর্ভিক্ষের সময় মুখ্যমন্ত্রী লিয়াকত আলীকে ঘেরাও করতে মিছিলে নেতৃত্ব দেয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার হন ভাসানী-মুজিব ও শামসুল হক।

সেই থেকে ’৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ক্রান্তিলগ্নেও মুজিব জেলে বন্দি ছিলেন। সে সময় জেলে থেকে ছাত্রদের আন্দোলনের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করে শেখ মুজিব ও মহিউদ্দিন আহমদ জেলের ভেতর অনশন ধর্মঘট পালন শুরু করেন (১৬ থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি)। শেখ মুজিব অনশনের কারণে ঢাকা থেকে ফরিদপুর জেলে স্থানান্তরিত হন ১৮ ফেব্রুয়ারি। এর মধ্যে ছাত্র নেতৃবৃন্দ তাদের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সময়ে সময়ে জেলখানায় গিয়ে শেখ মুজিবের সঙ্গে পরামর্শ করে আসতেন। ওই সময়ে শেখ মুজিব ছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগের যুগ্ম সম্পাদক এবং কার্যত দলের অন্যতম নীতিনির্ধারক। ভাষার এই মাসে শ্রদ্ধাভরে সম্মান করি বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় জীবন উৎসর্গকৃত শহিদদের এবং কৃতজ্ঞচিত্তে স্বীকার করি ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবিস্মরণীয় অবদানকে।

বাংলা ভাষা আন্দোলনে নারী

বাংলাদেশের নারীদের সামাজিক মর্যাদা বহুবছর ধরে সংগ্রাম আর পুরুষের পাশাপাশি লড়াইয়ের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’দাবির আন্দোলনে সহযোদ্ধা হয়ে ছাত্রদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন ছাত্রীরা। পাকিস্তান আর্মি ও পুলিশের তাক করা বন্দুকের নলকে উপেক্ষা করে ভাষার দাবির মিছিলগুলোতে ছিলেন তারা সামনের কাতারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা রাতে লুকিয়ে ভাষার দাবির বিভিন্ন স্লোগান সংবলিত পোস্টার এঁকেছেন।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে নারীরাই পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করে পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙে। আহতদের চিকিৎসায় বিশেষ ভূমিকা রাখে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রীরা। আহতদের চিকিৎসা সাহায্যের জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে মেয়েরা চাঁদা তুলে আনে। পুলিশের তাড়া খাওয়া ছাত্রদের নিজেদের কাছে লুকিয়ে রাখে। আন্দোলনের খরচ চালানোর জন্য অনেক গৃহিণী অলঙ্কার খুলে দেন। শুধু তাই নয়, ভাষা আন্দোলনে জড়িত হওয়ায় অনেক নারীকে জেলও খাটতে হয়েছে। কেউ হারিয়েছেন সংসার। কেউ আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে হয়েছেন বহিষ্কৃত। সে সময়য়র ঘটনা নিয়ে আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ, ভাষাসৈনিকদের স্মৃতিচারণা এবং দলিল ও বইতে এর প্রমাণ রয়েছে।

তমুদ্দন মজলিসে নারী

ভাষা আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নারীদের অনবদ্য ভূমিকা ছিল। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে বাংলাভাষার দাবিকে চাঙ্গা করতে গঠিত হয় তমদ্দুন মজলিস। নারী ভাষা সৈনিকদের মধ্যে আবুল কাশেমের স্ত্রী রাহেলা, বোন রহিমা এবং রাহেলার ভাইয়ের স্ত্রী রোকেয়া আন্দেলনকারী ছাত্রদের আজিমপুরের বাসায় দীর্ঘদিন রান্না-বান্না করে খাইয়েছেন। ১৯৫২ সালের ২৩ জানুয়ারি রাত ৪টার দিকে আবুল কাশেমের বাসা ঘিরে ফেলে পাকিস্তান পুলিশ।

ভিতরে আবুল কাশেম ও আব্দুল গফুরসহ অন্যরা ভাষা আন্দোলনের মুখপাত্র ‘সৈনিক’ পত্রিকা প্রকাশের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। পুলিশ দরজায় বারবার আঘাত করলে মিসেস রাহেলা কাশেম গভীর রাতে পারিবারিক বাসায় পুলিশ প্রবেশের চেষ্টার বিরুদ্ধে পুলিশের সঙ্গে দীর্ঘ তর্কবিতর্ক জড়িয়ে পড়েন। এ সুযোগে আবুল কাশেমসহ অন্যরা পেছনের দেয়াল টপকে পালাতে সক্ষম হন। এরপর পুলিশ ভিতরে ঢুকে কাউকে দেখতে না পেয়ে চলে যায়। ভাষা আন্দোলন শুরুর দিকে অন্দরমহলে নারীর এই অবদান আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচিগুলো এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

১৪৪ ধারা ভঙ্গসম্পাদনা

২১ ফেব্রুয়ারি নারী ভাষা সৈনিকরা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙ্গে দেয়ার মাধ্যমে আন্দোলনকারী দমাতে পুলিশের জারি করা ১৪৪ ধারা প্রথমেই ভেঙ্গে দিতে সক্ষম হন। পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙার মূল কাজটা রওশন আরা বাচ্চুসহ আরো কয়েকজন ছাত্রীরা দ্বারাই হয়। কারণ ১০ জন করে বের হওয়া প্রথম দুটি দলের অনেকেই গ্রেপ্তার হন। ছাত্ররা ব্যারিকেডের ওপর ও নিচ দিয়ে লাফিয়ে চলে যায়। পরে তৃতীয় দলে বেরিয়ে ব্যারিকেড ধরে টানাটানির কাজ শুরু করেন ছাত্রীরাই। সেদিন পুলিশের লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেলে অনেক ছাত্রী আহত হন। এরমধ্যে রওশন আরা বাচ্চু, সারা তৈফুর, বোরখা শামসুন, সুফিয়া ইব্রাহীম, সুরাইয়া ডলি ও সুরাইয়া হাকিম ছিলেন।

বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশে ভাষা আন্দোলন

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। পাকিস্তানি রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে এটি ছিল বাঙালি জাতির প্রথম বিদ্রোহ। ভাষা আন্দোলন তৎকালীন রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পূর্ব বাংলায় শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে।

২১ শে ফেব্রুয়ারি মিছিলে গুলি করে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে চট্টগ্রামে কবি মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি এবং তরুণ কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ ‘স্মৃতির মিনার’ শীর্ষক কবিতা রচনা করেন।

ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ শীর্ষক প্রবন্ধ

হাসান হাফিজুর রহমানের ‘একুশের সংকলন’ ভাষা আন্দোলন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা আবদুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’, সঙ্গীতশিল্পী আবদুল লতিফে রচনা ও সুরে ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ এবং বাগেরহাটের চারণ কবি শামসুদ্দিন আহমেদ রচনা করেন ‘তোরা ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি’ শীর্ষক গান।

ড. মুনীর চৌধুরী জেলে বসে রচনা করেন ‘কবর’ নাটক এবং জহির রায়হান রচনা করেন ‘আরেক ফাল্গুন’ শীর্ষক উপন্যাস। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রচিত এসব কবিতা, গান, নাটক ও উপন্যাস বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পরের বছর থেকে প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটি বাঙালির শহিদ দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ২১ ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটির দিন ঘোষিত হয়। বাঙালি

পূর্ব বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনে (৫২-৭১) ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য

প্রথমত: ভাষা আন্দোলন ছিল বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে সংগঠিত গণ আন্দোলন। এটি শুধু ভাষার মর্যাদার জন্যই গড়ে ওঠেনি। ভাষা আন্দোলনের ফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে। অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রথম পর্যায় হিসেবে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠাকে বাঙালিরা বেছে নেয়। এই বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাই ষাটের দশকে স্বৈরশাসন বিরোধী ও স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে আন্দোলনে প্রেরণা জোগায়।

দ্বিতীয়ত: ভাষা আন্দোলনের ফলে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিকাশ ঘটে। এই আন্দোলন দ্বিজাতি তত্ত্বের ধর্মীয় চেতনার মূলে আঘাত হানে। পাকিস্তান সৃষ্টির সাম্প্রদায়িক ভিত্তি ভেঙ্গে বাঙালিরা অসাম্প্রদায়িক চেতনার আন্দোলন শুরু করে। এর ফলে ধীরে ধীরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গড়ে ওঠে।

তৃতীয়ত: ভাষা আন্দোলনে মুসলিম লীগ জনগণের মানসিকতা ও স্বার্থ উপেক্ষা করে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এর ফলে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে দলটির শোচনীয়ভাবে পরাজয় ঘটে। এর পর আর নির্বাচনে মুসলিম লীগ জয়ী হয়নি।

চতুর্থত: ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি মোতাবেক ২১ ফেব্রুয়ারি শোক দিবস হিসেবে ছুটি ও শহিদ দিবস ঘোষণা করে। ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা ভাষা সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায়। ১৯৬২ সালে সংবিধানে তা বহাল থাকে।

ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ শীর্ষক প্রবন্ধ

পঞ্চমত: যুক্তফ্রন্ট পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য তুলে ধরে, যা ষাটের দশকে আওয়ামী লীগের ছয় দফায় পরিস্ফুটিত হয়। স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন চূড়ান্তভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপ নেয় যার প্রেরণা ছিল ভাষা আন্দোলন।

ষষ্ঠত: ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো কর্তৃক ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ এর স্বীকৃতি দান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে।

ভাষা আন্দোলন বাঙালির জাতীয়তাবাদ বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভাষা আন্দোলন সকলকে ঐক্যবদ্ধ করে। পাকিস্তানের প্রতি মানুষের মনে যে মোহ ছিল তা ধীরে ধীরে কেটে যায়। বাঙালি হিসেবে নিজেদের আত্মপরিচয়ের জন্য রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি গড়ে তোলার গুরুত্ব উপলব্দি করে। ভাষা কেন্দ্রীক এই ঐক্য বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি রচনা করে। এটিই পরবর্তীকালে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি অর্জন (পটভূমি ও তাৎপর্য):

পৃথিবীর ইতিহাসে ভাষার অধিকারের জন্য জীবন উৎসর্গ করা বাঙালির মতো অন্য কোনো জাতি পাওয়া যাবে না। নিজের ভাষা প্রতিষ্ঠায় একমাত্র বাঙালিই রক্ত দিয়েছিল। বাঙালি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অপশক্তি দ্বারা শোষণ, বঞ্চনা ও অবহেলার শিকার হয়েছে। তা থেকে মুক্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য শতাব্দীর পর শতাব্দী বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে সংগ্রাম করেছে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে এ দেশীয় কিছু বিশ্বাসঘাতকের ষড়যন্ত্রে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন হয়। সিরাজউদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশরা উপমহাদেশে ১৯০ বছর শাসন করে।

১৯৪০ সালে পাকিস্তানের জাতির জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দ্বিজাতিতত্ত্ব পেশ করেন। দ্বিজাতিতত্ত্বের মাধ্যমে ধর্মের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট ভারত নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পাকিস্তান ও ভারত ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীন হলেও বাঙালিরা পাকিস্তানের অধীনে দীর্ঘ ২৪ বছর পরাধীনই থেকে যায়। বাঙালিরা রাজনীতি, অর্থনীতি, ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, চাকরির অধিকারসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে বঞ্চিত হচ্ছিল। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবেই রাখতে চেয়েছিল।

ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ শীর্ষক প্রবন্ধ

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা মাত্রই বাঙালিরা প্রথমেই ভাষার প্রশ্নে বৈষম্যের শিকার হয়। সে সময় ৫৬ শতাংশ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলত। আর পাকিস্তানের অভিজাত শ্রেণির মাত্র ৬ শতাংশ উর্দু ভাষা ব্যবহার করত। বাংলা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু ভাষা হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার উর্দুকে বাঙালিদের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু বাঙালিরা শুরু থেকেই তীব্র প্রতিবাদ ও প্রত্যাখ্যান করে। ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেম বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠায় ‘তমদ্দুন মজলিশ’ প্রতিষ্ঠা করেন। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন করা প্রথম সংগঠনই হলো ‘তমদ্দুন মজলিশ।’

ভাষা আন্দোলনের শুরু থেকেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। সেদিন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। হরতালে বঙ্গবন্ধু নেতৃত্ব দেন এবং পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। নিজের ভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ নাম না জানা আরও অনেকে শহীদ হন। বাঙালির আন্দোলনের ফল হিসেবে পরে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সরকার সংবিধানে ২১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।

স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ২৯তম অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলায় ভাষণ দেন। প্রথম কোনো রাষ্ট্রনেতা হিসেবে বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক পরিম-লে তিনিই উপস্থাপন করেন। তার ভাষণের মধ্য দিয়ে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মর্যাদার আসনে আসীন করেছিল। মাতৃভাষার প্রতি আবেগ, অনুভূতি ও মমত্ববোধের জায়গা থেকেই তিনি বাংলায় বক্তৃতা করেছিলেন।

ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ শীর্ষক প্রবন্ধ

অবশ্য এর আগে তিনি ১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ায় জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বাংলায় বক্তৃতা করেন। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘আমি বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা। বাংলার কৃষ্টি, বাংলার সভ্যতা, বাংলার ইতিহাস, বাংলার মাটি, বাংলার আকাশ, বাংলার আবহাওয়া, তাই নিয়ে বাংলার জাতীয়তাবাদ।’ বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান আমলে ১৯৫২ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত নয়া চীনের আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলায় বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সম্মেলনে ৩৭টি দেশ থেকে ৩৭৮ জন প্রতিনিধি যোগদান করেছিল।

বাংলা ভাষাকে স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনেস্কোর প্রস্তাবে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের জন্য ১৮৮টি দেশ সমর্থন করে এবং ২০০০ সাল থেকে ২১ ফেব্রুয়ারিকে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করছে। ২০১০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বর্তমানে জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশ দিবসটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করছে।

বৈশ্বিক পরিসরে কোনো দেশ হিসেবে আফ্রিকার সিয়েরা লিওন বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। দেশটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অবদানের জন্য ২০০২ সালে বাংলাকে তারা মর্যাদা দেয়। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষার প্রসার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলা ভাষায় সংগীত, বইমেলা, কবিতা আবৃত্তি, বাংলা পত্রিকা, অনলাইন বাংলা পত্রিকা, টিভি চ্যানেল, সাপ্তাহিক পত্রিকা, বাংলা রেডিও স্টেশন, বাংলাভাষী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলা ভাষা আরও বিস্তৃতভাবে বৈশ্বিক রূপ লাভ করেছে।

ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ শীর্ষক প্রবন্ধ

ব্রিটিশরা এ দেশ থেকে প্রায় ৭৪ বছর আগে চলে গেলেও তাদের ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-ভাবনা থেকে আমরা এখনো বের হতে পারিনি। অনেকে নিজের ভাষা ব্যবহারে হীনম্মন্যতায় ভোগেন। ইংরেজি ব্যবহার করে অতি আধুনিক হওয়ার একটা প্রবণতা তাদের মধ্যে দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাকে অযত্ন ও অবহেলার চোখে দেখেন। দেশের প্রতিটি বাড়িতে এখন হিন্দি নাটক, সিনেমা, কার্টুনের মাধ্যমে শিশুরা বিভিন্ন হিন্দি শব্দ ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। বাংলা-ইংরেজি-হিন্দি মিলে বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে একটা জগাখিচুড়ি ভাষার সৃষ্টি হচ্ছে।

পৃথিবীব্যাপী এখন কালচারাল ইম্পেরিয়ালিজম বা সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ ব্যাপকভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ হলো একটি শক্তিশালী দেশের সংস্কৃতি, ভাষা-সাহিত্য, চলচ্চিত্র অন্য দুর্বল একটি দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের কারণে পৃথিবীর অনেক দেশের ভাষার বিলুপ্তি ঘটেছে। পৃথিবী থেকে প্রতি দুই সপ্তাহে একটি ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

ইংরেজি ভাষার সাম্রাজ্যবাদের জন্য অনেক ভাষা হারিয়ে গেছে। বিশ্বায়ন ও আকাশ সংস্কৃতির বদৌলতে তথ্য না চাইলেও দেখতে হচ্ছে। এভাবেই অবাধ তথ্যপ্রবাহের নামে সাম্রাজবাদী রাষ্ট্র দুর্বল দেশগুলোতে ভাষার মাধ্যমে তাদের ধ্যান, ধারণা, চিন্তা-ভাবনা, কৃষ্টি-কালচার, চলচ্চিত্র, সংগীতসহ নানা বিষয় জোর করে চাপিয়ে দিচ্ছে। এতে করে দুর্বল ভাষাগুলো পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে এবং মৃত্যু ঘটছে।

ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ শীর্ষক প্রবন্ধ

বলা হয়ে থাকে, আগামী ১০০ বছরে প্রায় ৩ হাজার ভাষা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বর্তমানে পৃথিবীতে আট হাজারেরও অধিক ভাষা প্রচলিত আছে। তবে হাজারো ভাষার মধ্যে বাংলা ভাষা পৃথিবীতে অত্যন্ত মর্যাদার আসনেই আছে। ভাষাভাষী জনসংখ্যার দিক দিয়ে বাংলা ভাষার অবস্থান পৃথিবীতে এখন সপ্তম। প্রায় ৩০ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। সারা পৃথিবীতেই বাংলা ভাষার ব্যবহার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top