ব্যবসায় উদ্যোগের সৃষ্টিতে আন্তকর্মসংস্থানের ভূমিকা নিরুপন।

ব্যবসায় উদ্যোগের ধারণা : উদ্যোগ যেকোনো বিষয়ের ব্যাপারে হতে পারে কিন্তু লাভের আশায় ঝুঁকি নিয়ে অর্থ, শ্রম বিনিয়োগ করা হলো ব্যবসায় উদ্যোগ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মনে করো তুমি বাঁশ ও বেত দিয়ে সুন্দর সুন্দর জিনিস তৈরি করতে পারো। এখন নতুন এক ধরনের বেতের চেয়ার দেখে সেটা বানানোর চেষ্টা করলে। এটা তোমার উদ্যোগ। এখন তুমি যদি অর্থ সংগ্রহ করে বাঁশ ও বেতের সামগ্রী তৈরি দোকানে স্থাপন করে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করো তখন এটি হবে ব্যবসায় উদ্যোগ। ব্যবসায় উদ্যোগ এর প্রধান উদ্দেশ্য মুনাফা অর্জন কিন্তু অন্যান্য উদ্যোগের উদ্দেশ্য জনকল্যাণ। একটি ব্যবসায় স্থাপনার ধারণা চিহ্নিতকরণ থেকে শুরু করে ব্যবসায়টি স্থাপন ও সফলভাবে পরিচালনাই ব্যবসায় উদ্যোগ।বিশদ ভাবে বলতে গেলে, ব্যবসায় উদ্যোগ বলতে বোঝায় লাভবান হওয়ার আশায় লোকসানের সম্ভাবনা জেনেও ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের জন্য দৃঢ় ভাবে এগিয়ে যাওয়া ও সফলভাবে ব্যবসায় পরিচালনা করা।

ব্যবসায় উদ্যোগের বৈশিষ্ট্য : যেকোনো উদ্যোগকে ব্যবসায় বলা যায়না তাই কোন উদ্যোগকে ব্যবসায় উদ্যোগ বিবেচিত করার জন্য নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো থাকা প্রয়োজন:

১) উদ্যোক্তার সকল কার্যাবলী ব্যবসায় উদ্যোগ। যার প্রাথমিক লক্ষণ নিজের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। ব্যবসায় উদ্যোগের মাধ্যমে একজন উদ্যোক্তা নিজের উপার্জনে ব্যবস্থা করতে পারেন।

২) এটি ব্যবসায় স্থাপনের কর্ম উদ্যোগ বা প্রচেষ্টা বা পরিকল্পনা। অর্থাৎ নতুন কিছু সৃষ্টির পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে ব্যবসায় উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।ব্যবসায় স্থাপন সংক্রান্ত সকল কর্মকাণ্ডে সফল ভাবে পরিচালনা করতে ব্যবসায় উদ্যোগ সহায়তা করে।

৩) ব্যবসায় উদ্যোগ এক ধরনের বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত যার কারণে ঝুঁকি আছে জেনেও লাভের আশায় ব্যবসায় পরিচালনা করা হয়। ব্যবসায় উদ্যোগ সঠিকভাবে ঝুঁকি পরিমাপ করতে এবং পরিমিত ঝুঁকি নিতে সহায়তা করে।

৪) ব্যবসায় উদ্যোগ এর অন্য একটি ফলাফল হল একটি পণ্য বা সেবা।

৫) ব্যবসায় উদ্যোগ এর ফলাফল হল একটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান। এর মানে হলো ব্যবসায় উদ্যোগ সম্পর্কে ধারণা কোন চিন্তা ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সহায়তা করে।

৬) ব্যবসায় উদ্যোগের মাধ্যমে মুনাফার পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা সৃষ্টি হয়। ব্যবসায় উদ্যোগ উদ্যোক্তাদের সমাজের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করতে অনুপ্রাণিত করে।

৭) ব্যবসায় উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন সম্পদ সৃষ্টি হয় ফলে যেমন মানবসম্পদ উন্নয়ন হয় তেমনি মূলধন গঠন হয়।

৮) ব্যবসায় উদ্যোগ সার্বিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখে।ব্যবসায় উদ্যোগ দেশের আয় বৃদ্ধি ও বেকার সমস্যার সমাধান সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারে।

৯) ব্যবসায় সংস্থাপন সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ সফলভাবে পরিচালনা করতে ব্যবসায় উদ্যোগ সাহায্য করে।

১০) ব্যবসায় উদ্যোগের মাধ্যমে উদ্যোক্তা নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে।

আত্মকর্মসংস্থানের ধারণা : দরিদ্র পরিবারের সন্তান এসএসসি পাস আজহার আলী ২০০০ সালে জাহাজে কাজ শুরু করেন। ছোট চাকরি খাটুনি অনেক কিন্তু বেতন অনেক কম। সংসার চলছিল না।বাধ্য হয়ে তাকে জাহাজের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে গ্রামে ফিরে আসতে হয়। ঔষুধ কোম্পানিতে চাকরি নেয়ার অনেক চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। তবে পরিশ্রমি আজহার দমে যাননি। বাড়ির আশেপাশে পতিত জমি নিয়ে কিছু একটা করার কথা ভাবতে থাকেন। উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ শুরু করেন পতিত জমিতে কলা চাষ। সপ্তাহে এখন তার ক্ষেত্রে ৭ মণ করলা ফলে। করলার আয় দিয়ে আজহারের ছয় সদস্যের পরিবারের ভরণ পোষণ করছে স্বাচ্ছন্দে। পিরোজপুর ভান্ডারিয়া মাটিভাংগা গ্রামে শিক্ষিত কৃষক আজহার আলী করলা চাষ করার পাশাপাশি নানা রকম সবজি আবাদ করে বেকারত্ব গুছিয়ে এখন স্বাবলম্বী দারিদ্র্যকে করেছেন জয়। আজহারের সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেকেই এখন সবজি আবাদ মনোনিবেশ করেছেন। যেকোনো বেকার যুবকের জন্য এটি অনুকরণীয়‌।

এই যে জনাব আজহার আলী নিজের দক্ষতা ও গুণাবলী তারা নিজেই নিজের কর্মসংস্থান করেছেন এটাই আত্মকর্মসংস্থান। এখন আমরা বুঝতে পারছি যে নিজস্ব পুঁজি অথবা ঋণ করা স্বল্প সম্পদ,নিজের বিবেক -বুদ্ধি, বিচার-বিশ্লেষণ ,দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আশেপাশের বিভিন্ন উৎস ব্যবহার করে নিজের প্রচেষ্টায় জীবিকা অর্জনের ব্যবস্থাকে আত্মকর্মসংস্থান বলে। পৃথিবীতে যতগুলো দেশ আছে তাদের মধ্যে আত্মকর্মসংস্থান একটি অতি জনপ্রিয় পেশা।

আত্মকর্মসংস্থান ও ব্যবসায় উদ্যোগের মধ্যে সম্পর্ক সম্পর্ক : আমরা জানি আত্মকর্মসংস্থান হল নিজস্ব পুঁজি অথবা ঋণ করা স্বল্প সম্পদ, নিজস্ব চিন্তা, জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে ন্যূনতম মজুরি নিয়ে আত্মপ্রচেষ্টায় জীবিকা অর্জনের ব্যবস্থা।জীবিকা অর্জনের বিভিন্ন পেশার মধ্যে আত্মকর্মসংস্থান একটি জনপ্রিয় পেশা। আমাদের চারপাশে এমন অনেক আত্মকর্মসংস্থান মূলক কর্মকান্ড দেখা যায়। কলেজ গেটের পাশে যে চানাচুর বা আমড়া বিক্রি করে সেটি ও তাদের আত্মকর্মসংস্থান। এরকম নানাবিধ জীবিকার উপায় আত্মকর্মসংস্থান আয়ের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে হাঁস-মুরগী পালন, নার্সারি, ফুলের চাষ, বাঁশ ও বেতের সামগ্রী তৈরি, টেইলারিং ইত্যাদি আত্মকর্মসংস্থানের আওতাভুক্ত।

ব্যবসায় উদ্যোগের সাথে আত্ম-কর্মসংস্থানের সম্পর্ক নিবিড়। আত্মকর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি নিজের কর্মসংস্থানের চিন্তা করে কাজে হাত দেন।তিনি সাধারণত প্রচলিত যে কোন কর্মকে জীবিকার উপায় হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন।যার মধ্যে সাধারণত নতুনত্ব বা সৃজনশীলতা থাকে না। নিজের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ ও মুনাফা অর্জনে আত্মকর্মসংস্থানের প্রধান উদ্দেশ্য।অন্যদিকে একজন উদ্যোক্তা নিজের কর্মসংস্থান ও আর্থিক স্বচ্ছতার জন্যে কাজ শুরু করলেও তিনি নতুন পণ্য বা সেবা সামগ্রীর উৎপাদন করে ব্যবসায় শুরু করেন, উক্ত পণ্যের বাজার চাহিদা সৃষ্টি করেন, আবার বাজারে প্রচলিত দ্রব্য সামগ্রী দিয়ে ব্যবসায় শুরু করলেও অল্পদিনের মধ্যেই তিনি উদ্যম ,সাহস ও সৃজনশীলতার দিয়ে অনেকের মধ্যে সাড়া জাগাতে সক্ষম হন। উদ্যোক্তার আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো তিনি নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির স্বপ্ন নিয়ে তার ব্যবসায় শুরু করেন। একজন আত্মকর্মসংস্থান কারী ব্যক্তি তখনই একজন উদ্যোক্তার পরিণত হবেন যখন তিনি নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি সমাজের আরও কয়েকজনের কর্মসংস্থানের চিন্তা নিয়ে কাজ শুরু করেন ,ঝুঁকি আছে জেনেও এগিয়ে যান এবং একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।সে ক্ষেত্রে সকল ব্যবসায় উদ্যোক্তাকে আত্মকর্মসংস্থানকারী বলা গেলেও সকল আত্মকর্মসংস্থানকারীকে ব্যবসায় উদ্যোক্তা বলা যায় না। (an entrepreneur is self employed, but someone who is self employed isn’t necessarily an entrepreneur.)

ব্যবসায় উদ্যোগের কার্যাবলি : ব্যবসায় উদ্যোগ সাধারন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে আলাদা।ব্যবসায় উদ্যোগের সাথে নতুনত্ব, সৃজনশীলতা ও সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি জড়িত।উদ্যোক্তা যা করেন তাই ব্যবসায় উদ্যোগ কার্যাবলী। ব্যবসায় উদ্যোগ এর কার্যাবলী বহুমুখী। এক্ষেত্রে উদ্যোক্তাকে তিন ধরনের কাজ পরিচালনা করতে হয়।প্রথমত, ব্যবসায় সম্পর্কিত তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ করতে হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ের সংগৃহীত তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত, মুনাফা পরিকল্পনা, সংগৃহীত তথ্য ও উপাত্ত পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। তৃতীয় পর্যায়ে ব্যবসায় উদ্যোগ বাস্তবায়নের কাজ সম্পাদন করতে হয়। নিন্মে ব্যবসায় উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলী তুলে ধরা হলো:

১) উদ্যোগ গ্রহণই ব্যবসায় উদ্যোগের প্রধান কাজ। যিনি উদ্যোগ গ্রহণ করবেন তিনি ঝুঁকি মোকাবেলা করার সাহস নিয়ে ব্যবসায়ে আসেন।তবু তাকে উদ্যোগ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেবার জন্য সংগৃহীত তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করতে হয়।

২) ব্যবসায় উদ্যোক্তাকে উৎপাদনের উপকরণ অর্থাৎ ভূমি, শ্রম, মূলধন ও সংগঠনকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে নতুন পণ্য বাস সেবা আবিষ্কার করতে হয় উদ্যোক্তা তার অভিনীত মূলধনের সর্বোচ্চ ব্যবহারের জন্য যেসকল পরিকল্পনা গ্রহণ করেন তা অবশ্যই দেশের প্রচলিত আইন ও সামাজিক রীতিনীতি দ্বারা সমর্থিত হয়।

৩) ব্যবসায় উদ্যোগ এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল তার উৎপাদিত পণ্য দ্রব্য বা সেবার সামগ্রীর বাজার সৃষ্টি করা। কারন বাজার সৃষ্টি করতে না পারলে ঝুঁকির পরিমাণ বেড়ে যায়। ভোক্তার মনোভাব ও চাহিদা অনুযায়ী পণ্য দ্রব্য সৃষ্টি করতে পারলে সাফল্যের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়।

৪) উদ্যোক্তা নিজস্ব বা ধার করা প্রাথমিক মূলধন নিয়ে ব্যবসায় শুরু করলেও ব্যবসায়ের এক পর্যায়ে অধিক মাধ্যমের প্রয়োজন হয়। তাই মূলধন সংগ্রহ করা এবং মূলধন সংগ্রহের উৎস ও কৌশল জানা ব্যবসায় উদ্যোগ এর অন্যতম কাজ।

৫) ব্যবসায়িক যোগাযোগের বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে বিভিন্ন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা ,বাজার সম্প্রসারণ, নতুন নতুন উপযোগ সৃষ্টি ব্যবসায় উদ্যোগ এর অন্যতম কাজ।ব্যবসায়কে যেহেতু সবসময় ঝুঁকি ও প্রতিযোগিতা মোকাবেলা করতে হয় সেজন্য উদ্যোক্তাকে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করা প্রয়োজন হয়।

৬) সাথে সাথে পণ্যের মান, পণ্যের মূল্য নির্ধারণ ও বিক্রয়োত্তর সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাকে দৃষ্টি রাখতে হয়।

৭) উদ্যোক্তার অন্যতম কাজ সময়ের দাবীতে নতুন কিছু উদ্ভাবন করা।

৮) ব্যবসায় উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে যাবার সম্ভাব্য সকল কারণ ও ঝুঁকি মোকাবেলায় সব সময় প্রস্তুত থাকা উদ্যোক্তার কার্যাবলীর মধ্যে পড়ে।

৯) সর্বোপরি উদ্যোগের মাধ্যমে নিজের কর্মসংস্থান, আর্থিকস্বচ্ছতা আনয়নের সাথে সমাজের মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা ব্যবসায় উদ্যোক্তার অন্যতম কা‌জ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top