বিপণনের ধারনা, ক্রমবিকাশ ও বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষন

নির্দেশনা:

  • বিপণনের ধারণা ব্যাখ্যা করতে করতে হবে।
  • বিপণনের ক্রমবিকাশ বর্ণনা করতে করতে হবে।
  • বিপণনের বৈশিষ্ট্যগুলো চিহ্নিত করতে হবে।
  • বাজার, বিক্রয় ও বিপণনের মধ্যে পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে হবে।

বিপণনের ধারনা, ক্রমবিকাশ ও বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষন

বিপণনের ধারণা

বিপণন বা বাজারজাতকরণ (ইংরেজি: Marketing) হলো পণ্য বা মূল্যের বিনিময়ে কোনো ব্যক্তি বা দলের প্রয়োজন ও অভাব পূরণ করার সামাজিক এবং ব্যবস্থাপকীয় কার্যক্রম। Converse-এর মতে, “সময়গত, স্থানগত এবং স্বত্ত্বগত উপযোগ সৃষ্টি করাই বিপণন”। আমেরিকান মার্কেটিং এ্যাসোসিয়েশন-এর প্রদত্ত সংজ্ঞানুসারে:“

সংগঠন ও স্টেক হোল্ডারদের সুবিধার্থে ক্রেতা সম্পর্কভিত্তিক ব্যবস্থাপনা এবং ক্রেতা সৃষ্টি, যোগাযোগ স্থাপন ও ভ্যালু প্রদানের লক্ষ্যে সম্পাদিত সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং প্রক্রিয়ার সমষ্টিকেই বিপণন বলে।”

মানুষ জন্মগ্রহণ করার পর থেকে আমৃত্যু বিভিন্ন পণ্য ব্যবহার করে। মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে তার চাহিদা মেটানোর জন্য প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের পণ্য বা সেবা ক্রয় ও ভোগ করে থাকে। ক্ষুধা নিবারণের জন্য খাবার ক্রয় করে, বাসস্থানের জন্য ঘর বাড়ি ক্রয় করে, আবার চিকিৎসার জন্য চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করে। পণ্য বা সেবা ভোগ করার জন্য মানুষ নির্দিষ্ট বাজার থেকে যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজন অনুসারে ক্রয় ও ভোগ করে।

লক্ষ্য করা যায় যে, পণ্য বা সেবার ধারণার সৃষ্টি থেকে শুরু করে ক্রেতাদের মাঝে তা পরিচিতিকরন, উৎসাহ প্রদান, পণ্য বন্টন, মূল্য নির্ধারণ, ক্রয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা প্রদান এবং বিক্রয়োত্তর সেবাসহ বিভিন্ন কাজের সাথে বিপণন বা বাজারজাতকরণ জড়িত।

বিপণনের ধারণা, ক্রমবিকাশ ও বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ

ল্যাটিন শব্দ Marcatus থেকে ইংরেজি Market শব্দের উৎপত্তি। এই Market শব্দ থেকে পরবর্তীতে Marketing শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। এর বাংলা প্রতিশব্দ হলো বিপণন বা বাজারজাতকরণ। অনেক সময়ই বিপণন বা মার্কেটিং দিয়ে শুধুমাত্র ক্রয় বিক্রয় বা প্রচারণা কার্যকে বোঝানো হয়ে থাকে। প্রকৃতপক্ষে ক্রয় বিক্রয় বা প্রচারণা হচ্ছে বিপণনের অনেক কাজের অংশবিশেষ।

বিপণন একটি পরিবর্তনশীল ও জটিল বিষয়। বর্তমান সময়ে বিপণন বলতে সন্তোষজনকভাবে ক্রেতা বা ভোক্তার প্রয়োজন সমূহ পূরণকে বুঝায়। বিপণন এর মূল উদ্দেশ্য হলো ক্রেতা ভ্যালু বা সুবিধা সরবরাহের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে নতুন করে ক্রেতাকে আকৃষ্ট করা এবং সন্তুষ্টি বিধানের মাধ্যমে বর্তমান ক্রেতাকে ধরে রাখা ও সন্তুষ্ট ক্রেতার সংখ্যা বৃদ্ধি করা।

সাধারণ অর্থে, বিপণনকে একটি প্রক্রিয়াভিত্তিক কাজ বলা হয়। যা ভোক্তাদের জন্য ভ্যালু বা সুবিধা সৃষ্টি করে, ভোক্তাদের সন্তুষ্টি বিধান করে এবং দীর্ঘমেয়াদী ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্ক সৃষ্টি করে ও বজায় রাখে।

অন্য অর্থে, ভোক্তার প্রয়োজন ও অভাব সন্তুষ্টি বিধানের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্য অর্জনের লক্ষ্যে উৎপাদন পূর্ব কিছু কার্যক্রম থেকে শুরু করে উৎপাদনকারীর নিকট থেকে পণ্য বা সেবা ভোক্তা বা ক্রেতার নিকট পৌঁছানো এবং ভোগ বা ব্যবহারের পরবর্তী পর্যায়ের কার্যক্রমের সমষ্টিকে বিপণন বলে।

বিপণনের ক্রমবিকাশ

বিপণনের ক্রমবিকাশ (Evolution of Marketing) : মানব সভ্যতা ও ব্যবসায়িক পরিবেশের বিবর্তনের সাথে সাথে বিপণন ব্যবস্থার ক্রমবিকাশ ঘটেছে। বর্তমান সময়ে সকল ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে বিপণনের ব্যবহার দেখা যায়। বিপণনের ক্রমবিকাশ এ পর্যায়ে আলোচনা করা হলো:

১. আত্মনির্ভরশীলতার যুগ (Era of self-Sufficiency) : মানবসভ্যতার প্রথমদিকে মানুষ প্রয়োজনীয় জিনিস নিজেই উৎপাদন করত ও মিলিতভাবে ভোগ করত। নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পর উদ্বৃত্ত পণ্য সংরক্ষণ করার ধারণা ছিল না। এ কারণে পণ্য বিনিময়ের কোন প্রয়োজনীয়তা ছিল না। তাই বিপণনের ধারণাও বিদ্যমান ছিল না। এই সময়কে প্রাচীন সভ্যতার যুগও বলা হয়।

২. বিনিময় যুগ (Era of Exchange) : সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের চিন্তা-চেতনার বিকাশ ঘটে। প্রাচীন আত্মনির্ভরশীলতার যুগের এক পর্যায়ে মানুষ লক্ষ করে যে, মানুষ নিজের প্রয়োজন মেটানোর পরও উৎপাদিত পণ্য উদ্বৃত্ত থেকে যায়। আবার, একজন মানুষ তার প্রয়োজনীয় সকল পণ্য একা উৎপাদন করতে পারে না এবং সব ধরণের পণ্য উৎপাদনে মানুষের পারদর্শীতাও নেই। এই পরিস্থিতিতে মানুষ যে ধরনের পণ্য উৎপাদনে পারদর্শী সেই পণ্য উৎপাদন করতে থাকে এবং উদ্বৃত্ত পণ্য একে অপরের সাথে বিনিময় করা শুরু করে। বিনিময় প্রথার (Barter System) এই সময়কে বিনিময় যুগ বলা হয়। এই সময়ে পণ্য বিনিময় করার জন্য ব্যবসায়ী শ্রেণির উদ্ভব হয় যারা নির্দিষ্ট স্থানে পণ্য আদান-প্রদান করত। ক্রমান্বয়ে বাজার, ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও বিপণনের ধারণা প্রবর্তিত হয়।

৩. উৎপাদন যুগ (Era of Production) : উৎপাদন যুগের শুরু হিসেব ধরা হয় ১৮৭০ সাল থেকে যার ব্যাপ্তী ১৯৩০ সাল পর্যন্ত। পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে লাভবান হবার ধারণা আসার পর উৎপাদনকারী অধিক উৎপাদনে। উৎসাহিত হয়। এই সময়ে উৎপাদনের উপর অধিক গুরুত্ব থাকার জন্য এই যুগকেউৎপাদন যুগ বলে। এই সময়ে উৎপাদনকারী অধিক পণ্য উৎপাদন করার জন্য পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ করার নিমিত্তে বিভিন্ন ধরণের যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করা শুরু করে এবং শ্রমিক নিয়োগ করতে থাকে।

৪. বিক্রয় যুগ (Era of Sales) : ১৯৩০ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত সময়কালকে বিক্রয় যুগ হিসেবে ধরা হয়। উৎপাদকের সংখ্যা ও উৎপাদনের দক্ষতা বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে উৎপাদনের। পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এর ফলে ভোক্তারা বিভিন্ন পণ্য থেকে পচ্ছন্দমতো পণ্য ক্রয়ের সুযোগ পায়। উৎপাদনকারী উৎপাদিত পণ্যের বিক্রয় নিশ্চিত ও বৃদ্ধি করার জন্য বিক্রয়ের বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে থাকে। এই সময়ে উৎপাদনকারী বিক্রয় কৌশল হিসেবে বিজ্ঞাপন, ব্যক্তিক বিক্রয়, বিক্রয় প্রসার ইত্যাদি কৌশল প্রয়োগ করে। বিক্রয় ও বিক্রয় কৌশলের প্রাধান্য থাকার জন্য এই সময়কে বিক্রয় যুগ বলা হয়।

৫. আধুনিক বিপণন যুগ (Era of Modern Marketing) : আধুনিক বিপণন যুগের শুরু ১৯৫০ সাল থেকে যা এখনও চলমান। এই যুগে ভোক্তার প্রয়োজন, অভাব ও চাহিদার বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ার কারণে ভোক্তার সন্তুষ্টির প্রতি খেয়াল রেখে পণ্য ও সেবা উৎপাদন ও বিপণন করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা হয়। এই সময়েই ভোক্তাকেন্দ্রিক বিপণন কার্যক্রম শুরু হয়।

৬. সামাজিক বিপণন যুগ (Era of Social Marketing) : ১৯৭২সালের পরে সামাজিক বিপণন ধারণার উদ্ভব হয়। এই যুগে ভোক্তার সন্তুষ্টির সাথে সাথে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার বিষয়টি প্রাধান্য পায়। সামাজিক বিপণন যুগে সমাজ, পরিবেশ ও মানুষের কল্যাণের বিষয় বিবেচনায় রেখে ব্যবসায়ীরা প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জন ও ভোক্তার সন্তুষ্টি অর্জনে মনোনিবেশ করে। সমাজের জন্য কল্যাণকর ও পরিবেশ বান্ধব পণ্য ও সেবা উৎপাদন ও সরবরাহ করতে দেখা যায় এই সময়ে।

৭. সম্পর্কভিত্তিক বিপণন যুগ (Era of Relationship Marketing) : সম্পর্কভিত্তিক বিপণন যুগ শুরু হয় ১৯৯০ সালে। বর্তমান যুগে ব্যবসায়ীরা ক্রেতা, ভোক্তা, সরবরাহকারী, উৎপাদনকারীসহ অন্যান্য সম্পর্কযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাথে দীর্ঘমেয়াদী সুসম্পর্ক তৈরি ও সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করে থাকে। ভ্যালুভিত্তিক সুসম্পর্ক তৈরি ও সম্পর্ক রক্ষা করার উপর গুরুত্ব দেওয়ার জন্য এই যুগকে সম্পর্কভিত্তিক বিপণন যুগ বলা হয়। ব্যবসায়ীরা এখন নতুন বা সম্ভাব্য ক্রেতা তৈরির চেয়ে বর্তমান ক্রেতার সাথে সুসম্পর্ক ধরে রাখার উপর বেশি গুরুত্বারোপ করছে।

উপরিউক্ত আলোচনার মাধ্যমে বলা যায় যে, সময়ের সাথে সাথে বিপণনের কার্যক্রমের ধারার পরিবর্তন এসেছে। লক্ষ্য করা যায় যে, কোন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, ব্যবসায়িক পরিবেশ ইত্যাদির উপর সে দেশের বিপণন কার্যক্রম নির্ভর করে। উন্নত দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের বিপণনের কার্যক্রম ততটা গতিশীল নয়। এর কারণ বাংলাদেশে এখনও সকলক্ষেত্রে বিভিন্ন বিপণন মতবাদের কার্যক্রম পুরোদমে পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি।

বাজার, বিক্রয় ও বিপণনের মধ্যে পার্থক্য

বাজার, বিক্রয় ও বিপণন শব্দগুলো কাছাকাছি হলেও এদের মাঝে অর্থগত ও ব্যবহারিক দিক থেকে পার্থক্য রয়েছে। নিম্নে পার্থক্য গুলো উল্লেখ করা হলো।

১. সংজ্ঞা:

  • বাজার- বাজার হল কোন পণ্যের বর্তমান ও সম্ভাব্য ক্রেতার সমষ্টি।
  • বিপণন- প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনের জন্য পণ্য বা সেবা সৃষ্টি ও বিনিময়ের মাধ্যমে ক্রেতা ও ভোক্তার সন্তুষ্টি অর্জন করাকে বিপণন বলা হয়।
  • বিক্রয়- বিক্রয় হলো নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে পণ্য বা সেবার মালিকানা হস্তান্তর এর সাথে জড়িত বিভিন্ন কার্যক্রমের সমষ্টি।

২. উদ্দেশ্য:

  • বাজার- ক্রেতা ও ভোক্তাদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করা।
  • বিপণন- ক্রেতা ও ভোক্তার চাহিদা পূরণ করে সন্তুষ্টি অর্জন করা।
  • বিক্রয়- বিক্রয় এর উদ্দেশ্য হলো পণ্য বা সেবার মালিকানা হস্তান্তর।

৩. উপযোগ:

  • বাজার- পণ্যের স্বত্বগত উপযোগ সৃষ্টি হয়।
  • বিপণন- পণ্যের সময়গত, স্থানগত ও স্বত্বগত উপযোগ সৃষ্টি হয়।
  • বিক্রয়- মালিকানাগত উপযোগ সৃষ্টি হয়।

৪. গুরুত্ব:

  • বাজার- বিক্রেতার প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
  • বিপণন- ক্রেতা বা ভোক্তার প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
  • বিক্রয়- পণ্য বিক্রয় এবং মুনাফা বৃদ্ধির প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

৫. পরিকল্পনা:

  • বাজার- স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা থাকে।
  • বিপণন- দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকে।
  • বিক্রয়- বিক্রয় পরিকল্পনা সাধারণত স্বল্পমেয়াদী হয়ে থাকে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top