বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশে ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব মূল্যায়ন

ভাষা আন্দোলন: পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই শাসক গোষ্ঠী ঊর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার চক্রান্ত শুরু করে। পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) জনগণ এ চক্রান্তের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই প্রতিবাদ করে। তারা ঊর্দুর পাশাপাশি বাংলা ভাষাকেও রাষ্ট্রভাষা করার ন্যায়সঙ্গত দাবি তোলে।

পাকিস্তান সৃষ্টির আগে থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে উর্দু এবং বাংলা ভাষা নিয়ে বিতর্ক ছিল। বিশেষত সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের ভাষা ছিল ঊর্দু। ঢাকার নবাব পরিবারেরও ভাষা ছিল ঊর্দু। ১৯০৬ সালে ঢাকায় নিখিল ভারত মুসলিম লীগের প্রথম অধিবেশনেও ঊর্দু-বাংলার বিতর্ক দেখা দেয়। মুসলিম লীগ প্রধান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঊর্দুকে দলের যোগাযোগের ভাষা হিসাবে চালুর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু তখন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, আবুল হাশিম প্রমুখ নেতার বিরোধিতায় সে উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্বাহ্নে নতুন রাষ্ট্রের ‘রাষ্ট্র ভাষা’ কি হবে তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। ভাষা আন্দোলনের পটভূমিকে দু’টি ভাগে ভাগ করে আলোচনা করা যায়।

প্রথম পর্যায় (১৯৪৮-১৯৫০) : ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি গণ পরিষদের অধিবেশনে ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত উর্দুর সাথে বাংলাকেও গণপরিষদের ভাষা হিসাবে ব্যবহারের প্রস্তাব করেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ও পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করায় তা বাতিল হয়ে যায়। এর প্রতিবাদে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি সমগ্র পূর্ব বাংলায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে হরতাল পালিত হয়। ২১ মার্চ জিন্নাহ রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ কার্জন হলের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ঘোষণা করেন ‘উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। জিন্নাহর ২৪ মার্চ বক্তৃতার তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করে উপস্থিত ছাত্ররা ‘না’ ‘না’ ধ্বনি করে ওঠে।

দ্বিতীয় পর্যায়ে (১৯৫২ সাল): বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে ছাত্রসমাজের সঙ্গে লিখিত চুক্তি হয়। চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও (১৫ই মার্চ ১৯৪৮), নাজিমুদ্দীন তা ভঙ্গ করে ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে একমাত্র উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার নতুন ঘোষণা দেন। তাঁর এ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্ব। ১৯৫২ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে অনুষ্ঠিত ছাত্র সমাবেশ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারির সমগ্র পূর্ব বাংলায় ধর্মঘট ও সভা-সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি কর্মসূচিকে সফল করে তোলার জন্য ১১ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি সাফল্যের সাথে ‘পতাকা দিবস’ পালিত হয়। কারাগারে আটক অবস্থায় ১৯৫২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগ নেতা মহিউদ্দিন আহমেদ আমরণ অনশন শুরু করেন। নুরুল আমিন সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি বিকেল থেকে ঢাকা শহরে এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করেন। শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ করেন। সংগ্রামী ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিক্ষোভ প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা ছোট ছোট শোভাযাত্রাসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরনো কলাভবন প্রাঙ্গনে মিলিত হয়। পুলিশি বেষ্টনী ভেদ করে ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ মিছিল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে এলে পুলিশ মিছিলে গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে নিহত হন, সালাম, বরকত, রফিক, শফিউর, জব্বারসহ নাম না জানা কয়েকজন যুবক। পুলিশের গুলিতে আহত হন অন্তত ১০ জন ছাত্র । ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে সারাদেশে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-শ্রমিক-বুদ্ধিজীবী পূর্ণ দিবস হরতাল পালন করে। ভাষা আন্দোলনে শহীদদের অবদান ও স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার জন্য মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গনে ছাত্রদের দ্বারা গড়ে ওঠে শহীদ মিনার। ভাষা শহীদ শফিউরের পিতা শহীদ মিনার উদ্বোধন করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে মেনে নিতে সম্মত হয়। ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দেয়া হয়। ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

১৯৫২ সালের ভাষা-আন্দোলন নানাবিধ কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিম্নে তা আলোচনা করা হলো।

বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ: ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ ঘটে। বাঙ্গালি জনগোষ্ঠী সাম্প্রদায়িক মনোভাব ত্যাগ করে ভাষাকে কেন্দ্র করে নতুন আত্মপরিচয় খুঁজে পায়। রাজনীতি গবেষক বদরুদ্দীন উমরের মতে, ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙ্গালি মুসলমান নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করে। এর আগে বাঙ্গালি মুসলমান তার আত্মপরিচয় খুঁজে আরবের মরুভূমিতে। মূলত ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে হিন্দু মুসলমান বাঙ্গালির চেতনায় অসাম্প্রদায়িক ভাবনা প্রোথিত হয়।

সংহতি ও একাত্মবোধ: ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতির সকল স্তরের মধ্যে জাতীয় সংহতি ও একাত্মতাবোধের সৃষ্টি করে। হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পায়। শুধু ছাত্র-জনতাই নয়, কৃষক, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী শ্রেণীও এক কাতারে শামিল হয়ে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে।

অধিকার সচেতনতাবোধ: ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙ্গালি জাতির রাজনৈতিক অধিকার সচেতনতাবোধ জাগ্রত হয়। এর মধ্য দিয়ে বাঙ্গালি জাতি অন্যায়, অত্যাচার ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শিক্ষা লাভ করে।

যুক্তফ্রন্টের জয়লাভ: মহান একুশের রক্তদানের ফলে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা বিকশিত হয়, সে চেতনা থেকেই যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট মুসলিম লীগকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে।

স্বাধীনতার অনুপ্রেরণা: আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ নিহিত ছিল ভাষা আন্দোলনের মধ্যে। এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই ধাপে ধাপে বাঙালি জনগোষ্ঠী ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দেয়।

যুক্তফ্রন্ট

১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে পাকিস্তানের মুসলিম লীগ বিরোধী পূর্ব পাকিস্তানের কয়েকটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনী মোর্চা বা জোট গঠন করে। এই জোট ‘যুক্তফ্রন্ট’ নামে পরিচিত। প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগ ছিল জোট গঠনের মূল উদ্যোক্তা। ১৯৫৩ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যুক্তফ্রন্টে মূলত চারটি রাজনৈতিক দল ছিল। এগুলো হল – মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী মুসলিম লীগ, ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন কৃষক-শ্রমিক পার্টি, মাওলানা আতাহার আলীর নেতৃত্বাধীন নিজাম-ই-ইসলামী এবং হাজী দানেশের নেতৃত্বাধীন বামপন্থী গণতন্ত্রী দল। নির্বাচন যুক্তফ্রন্ট প্রতীক হিসাবে বেছে নেয় ‘নৌকা’ প্রতীক। মুসলিম লীগ ও পশ্চিম পাকিস্তানী প্রভাবের বিরোধিতা ছিল জোটের ভিত্তি। বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদী চেতনাকে গুরুত্ব দিয়ে যুক্তফ্রন্ট পূর্ব-বাংলার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ২১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে মর্যাদা দান, বিনা খেসারতে জমিদারী প্রথার উচ্ছেদ সাধন করে ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে উদ্বৃত্ত জমি বণ্টন, ‘পাট’ ব্যবসাকে জাতীয়করণ, পূর্ব বাংলাকে লবণের ক্ষেত্রে স্বনির্ভর করে তোলা, সেচ ব্যবস্থার উন্নতি সাধনসহ বিভিন্ন দাবি-দাওয়া ২১ দফায় সংযুক্ত ছিল।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনের ফলাফল

১৯৫৪ সালের ৮ মার্চ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৩০৯টি আসনের মধ্যে মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত ছিল ২৩৭টি আসন। যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসনে জয়লাভ করে। এর মধ্যে আওয়ামী মুসলিম লীগ পায় ১৪৩টি আসন, প্রদত্ত ভোটের ৬৪ ভাগ লাভ করে মুসলিম লীগ বিরোধী যুক্তফ্রন্ট। অন্যদিকে সরকারি দল মুসলিম লীগ পায় মাত্র ৯টি আসন। তা ছিল প্রদত্ত ভোটের ২৭ ভাগ। বাকি ৫টি মুসলিম আসনের ৪টি পায় স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। একটি পায় খেলাফত-ই-রব্বানী পার্টি। এছাড়া নারীদের জন্য সংরক্ষিত ৯টি আসনের সবকটিই যুক্তফ্রন্ট লাভ করে।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনের তাৎপর্য ও যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের কারণ

১৯৫৪ সালের নির্বাচন পূর্ব পাকিস্তানে সার্বজনীন প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচন। বিভিন্ন কারণে এই নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম। মূলত এ নির্বাচনের মাধ্যমে বাঙ্গালি জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে ব্যালটের মাধ্যমে মুসলিম লীগের অবহেলা, শোষণ আর চক্রান্তের জবাব দেয়। নিম্নে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের গুরুত্ব বা তাৎপর্য আলোচনা করা হল।

১। বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ

নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয় ছিল মূলত বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদেরই বিকাশ। এই নির্বাচনের মধ্যদিয়ে বাঙ্গালিরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে

রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হয়। বাঙ্গালি জাতি তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আরো সচেতন হয়ে ওঠে।

২। মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রভাব বৃদ্ধি

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়ী প্রার্থীরা ছিলেন মূলত মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণি। অন্যদিকে মুসলিম লীগের প্রার্থীরা ছিলেন জমিদার শ্রেণির কিংবা সাম্প্রদায়িক নেতা। নির্বাচনে মধ্যবিত্ত প্রার্থীদের বিজয়ের কারণে বাংলার রাজনীতিতে মধ্যবিত্ত শ্রেণি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। রাজনীতি জমিদার-জোতদার মোল্লাদের হাত থেকে সাধারণ মানুষের হাতে চলে আসে।

৩। অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিকাশ

পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি বিকাশের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। যুক্তফুন্টের নির্বাচনে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির ধারাই জয়যুক্ত হয়। এর ফলে বাংলার রাজনীতিতে অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনা আরো বিস্তৃত হয়।

৪ । মুসলিম লীগের পরাজয়

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির বিয়োগান্তক ঘটনা, লবণ সংকট, পাট শিল্পজনিত কেলেঙ্কারি, স্বায়ত্তশাসন বিরোধী পদক্ষেপ গ্রহণ প্রভৃতির ফলে পূর্ব বাংলার বাঙালি জনগণ মুসলিম লীগ শাসনের প্রতি বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। এর ফলে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের পরাজয় ও ভরাডুবি ঘটে। নির্বাচনের মধ্যদিয়ে মুসলিম লীগ ও অবাঙালী নেতৃত্ব সম্পর্কে বাঙালি জনগোষ্ঠীর ধারণা পাল্টে যায়।

৫। মুসলিম লীগের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনে অনীহা

১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব ভিত্তিক পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রতিশ্রুতি তৎকালীন পূর্ব বাংলার মুসলিম জনগোষ্ঠীকে পাকিস্তান আন্দোলনে ব্যাপকভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পর মুসলিম লীগ সরকার পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রদানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। উপরন্তু এ ধরনের চিন্তাধারাকে বিচ্ছিন্নতাবাদ বলে আখ্যায়িত করে। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ এ ধরনের বঞ্চনা ও প্রতারণা মেনে নিতে পারেনি।

৬। যুক্তফ্রন্টের কর্মসূচি

যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহারের মধ্যে পূর্ব বাংলার সাধারণ কৃষক-শ্রমিক সকলের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছিল। যুক্তফ্রন্টের ইশতেহার জনগণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

৭। মুসলিম লীগের অন্তর্দ্বন্দ্ব

মুসলিম লীগ থেকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পদত্যাগ করে ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ গঠন করেন। মাওলানা ভাসানী ও এ কে ফজলুল হকসহ প্রমুখ নেতার মুসলিম লীগ ত্যাগ দলটিকে দুর্বল করে দেয়।

৮। যুক্তফ্রন্টের জনপ্রিয় নেতৃত্ব

যুক্তফ্রন্টের জয়ের তিন প্রধান নেতা ছিলেন এ.কে. ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী ও মাওলানা ভাসানী। এই নেতৃবৃন্দ ছাড়াও বয়সে তরুণ নেতা ও ছাত্রনেতারা ছিল দলের বড় শক্তি। তরুণ ছাত্ররা এ দলের জয়ের জন্য ভূমিকা রাখেন। বিশেষত শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, আতাউর রহমান খানসহ ত্যাগী কর্মীরা দেশব্যাপী যুক্তফ্রন্টের পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি করেন।

৬ দফা

বাঙালি জনগোষ্ঠীকে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসন-শোষণ নিপীড়ন থেকে রক্ষা করতে নন্দিত জননেতা শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ছয় দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে ১৯৬৬ সালের ৫-৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বিরোধী দলের এক কনভেনশনে শেখ মুজিবুর রহমান এ প্রস্তাব পেশ করেন। ছয় দফা প্রস্তাবকে বঙ্গবন্ধু ‘বাঙ্গালির মুক্তিসনদ’ হিসাবে আখ্যায়িত করেন।
ছয় দফা প্রস্তাব

লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামো হবে যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রকৃতির। সরকার হবে সংসদীয় ধরনের। প্রদেশগুলো পূর্ণ স্বায়ত্ত্বশাসন ভোগ করবে। সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে গঠিত আইন সভা বা পার্লামেন্ট হবে সার্বভৌম।

২। যুক্তরাষ্ট্রীয় বা কেন্দ্রিয় সরকারের হাতে থাকবে কেবল দেশরক্ষা ও পররাষ্ট্র।

৩। দেশের দুই অঞ্চলের জন্য দু’টি পৃথক অথচ সহজে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা চালু থাকবে।

৪। সকল প্রকার ট্যাক্স, খাজনা ও কর ধার্য এবং আদায়ের ক্ষমতা প্রাদেশিক বা আঞ্চলিক সরকারের হাতে থাকবে। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয় নির্বাহের জন্য আদায়কৃত অর্থের একটা নির্দিষ্ট অংশ কেন্দ্রিয় সরকার পাবে।

৫। বৈদেশিক মুদ্রার ওপর প্রদেশ বা অঙ্গরাজ্যগুলোর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে। বৈদেশিক বাণিজ্য ও সাহায্যের জন্য প্রদেশ বা অঙ্গরাজ্যের সরকারগুলো অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ও চুক্তি করতে পারবে।

৬। জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রদেশ বা অঙ্গরাজ্যগুলো আধা-সামরিক বাহিনী’ বা ‘মিলিশিয়া’ রাখতে পারবে।
বঙ্গবন্ধুর ছয়দফা আন্দোলন

পূর্ব বাংলায়ও আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিব বিরোধীরা এ প্রস্তাবকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসাবে আখ্যায়িত করে প্রত্যাখান করেন। কিন্তু শেখ মুজিব ছিলেন ছয় দফা প্রশ্নে অবিচল। তিনি সরাসরি ছয়দফা নিয়ে জনগণের দরবারে হাজির হলেন, তিনি ছয় দফাকে ‘আমাদের বাঁচার দাবি’ হিসাবে আখ্যায়িত করেন। মার্চ মাসে তিনি আওয়ামী লীগের কাউন্সিল ডেকে ৬-দফা কর্মসূচি অনুমোদন করিয়ে নেন। অর্থাৎ শেখ মুজিব এককভাবে ছয়দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন, পরবর্তীতে তিনি দলের স্বীকৃতি আদায় করেন।

ছয় দফার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া

ছয় দফার প্রশ্নে পাকিস্তানের শাসক চক্রের মনোভাব ছিলো অত্যন্ত নেতিবাচক। পাকিস্তানের দু’অংশেই প্রতিক্রিয়াশীল চক্র ছয় দফার বিরুদ্ধে লাগাতার প্রচারণা চালিয়েছে। কেননা ছয় দফা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিক শাসন কাঠামোর মূলে আঘাত করে। আঞ্চলিক পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও মুদ্রা পাচার রোধের বিষয়টি প্রাধান্য পাওয়ায় পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক চক্র দিশেহারা হয়ে পড়ে। লাহোরে ছয় দফা উত্থাপিত হবার পরদিনই পাকিস্তানের পত্র-পত্রিকায় শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আখ্যা দেয়া হয়। করাচীতে পূর্ব পাকিস্তানের আইন ও সংসদীয় মন্ত্রী আব্দুল হাই চৌধুরী ছয় দফাকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী তৎপরতা’ হিসাবে আখ্যায়িত করেন। প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খান মন্তব্য করেছিলেন, ‘ছয় দফার পরিণতি
হবে গৃহযুদ্ধ’। তিনি সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধ নিরসনে শেখ মুজিব ও তাঁর সমর্থকদের প্রতি অস্ত্রের ভাষা প্রয়োগের হুমকি দেন। পাকিস্তানী শাসক চক্র ১৯৬৬ হতে ১৯৬৯ পর্যন্ত বেশির ভাগ সময়ই শেখ মুজিবকে কারাগারে আটক রাখে। ছয় দফার পক্ষে প্রচার চালানোর জন্য আওয়ামী লীগে নেতা কর্মীদের উপর অত্যাচারের খড়গ নেমে আসে।

ছয় দফার গুরুত্ব

পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ছয়দফার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। নিম্নে তা আলোচনা করা হল।

১। শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ: ছয়দফা ছিল পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারে শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই ছয় দফাকে ‘বাংলার কৃষক, মজুর, শ্রমিক, মধ্যবিত্ত তথা আপামর জনসাধারণের মুক্তির সনদ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

২। স্বায়ত্তশাসনের দাবি: ছয় দফা মূলত বাঙালির অধিকারের দাবি। বস্তুতপক্ষে, ছয় দফার মধ্যদিয়েই পূর্ব বাংলাকে একটি পৃথক অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করে অধিক স্বায়ত্তশাসন দাবি করা হয়েছিল।

৩। বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ: ছয় দফাকে কেন্দ্র করে বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের চরম বিকশ ঘটে। জাতীয়তাবাদের বিকাশে কেবল ভাষা-সংস্কৃতিই ভূমিকা রাখে না। অর্থনৈতিক স্বার্থও জাতীয়তাবাদের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয়। ছয় দফা ছিল বাঙ্গালির অর্থনৈতিক স্বার্থকেন্দ্রিক।

8। আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবরের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি: বাঙ্গালির স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে ছয় দফা প্রস্তাব উত্থাপন করায় পূর্ব বাংলায় শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক তালুকদার মনিরুজ্জামানের মতে, ছয় দফাকে কেন্দ্র করে বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের ‘র্যাডিক্যাল’ আন্দোলন শেখ মুজিবের হাতে অর্পিত হয়।

৫। ১৯৭০ এর নির্বাচনে বিজয়: বঙ্গবন্ধু নির্বাচনী প্রচারে ১৯৭০ এর নির্বাচনকে ছয় দফা প্রশ্নে ‘গণভোট’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ছয় দফা প্রস্তাবকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। ছয় দফা ও বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তিকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।

৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান

১৯৬৬ সালে ছয় দফা উত্থাপিত হওয়ার পর দ্রুত তা বাংলার গ্রামগঞ্জে জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৬৭ সালের মাঝামাঝি ছয়দফা আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ূব বিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়। এরই প্রেক্ষাপটে দায়ের করা হয় ষড়যন্ত্রমূলক আগরতলা মামলা। আগরতলা মামলা ছিল সামরিক একনায়ক আইয়ূব খানের শাসনামলের এক ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। বাঙ্গালির অধিকার আদায়ের লড়াই নস্যাৎ করতে এবং আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে রাজনীতির ময়দান হতে নির্মূল করতে পাকিস্তানী শাসক চক্র এ ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দায়ের করে।

রাষ্ট্রদোহিতার অভিযোগে ১৯৬৮ সালের ৬ জানুয়ারি ২ জন সিএসপি অফিসারসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। মামলার আর্জিতে বলা হয়, অভিযুক্তরা পাকিস্তানের একটি বিশেষ দিনে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকারকে উৎঘাত করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করেছে। পরিকল্পনা মতে তারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে (পূর্ব পাকিস্তানকে) ‘স্বাধীন’ হিসাবে ঘোষণা করবে। রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ করে, ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় অভিযুক্তরা ভারতীয় কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তার সাথে এ ষড়যন্ত্রের ‘নীল নকশা’ প্রণয়ন করে। অভ্যুত্থান সফল করার জন্য তারা ভারতীয়দের নিকট থেকে অর্থ ও অস্ত্র সংগ্রহ করেন বলে অভিযোগ করা হয়। যদিও পরবর্তীতে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। আগরতলা মামলার প্রথমদিকে শেখ মুজিবুর রহমানকে যুক্ত করা হয়নি। কিন্তু ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি শেখ মুজিবকে প্রধান আসামী করে পূর্বের ২৮ জনসহ মোট ৩৫ জনের বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্র পরিকল্পনা ও পরিচালনা’র অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করা হয়। এক্ষেত্রে অভিযোগনামায় বলা হয়, শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ও ভারতের সহযোগিতায় অভিযুক্ত সামরিক সদস্যরা পূর্ব পাকিস্তানকে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে পাকিস্তান হতে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র করেছিল।

আগরতলা মামলাকে কেন্দ্র করে পূর্ব বাংলার রাজনীতি ক্রমেই বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ছয় দফার স্বীকৃতি ও শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে জনগণ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সূচনা করে। ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া ও মেনন গ্রুপ), জাতীয় ছাত্র ফেডারেশনের একাংশ (দোলন গ্রুপ), ঢাকা বীমা ও বৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ঐক্যবদ্ধ হয়ে আইয়ূব বিরোধী ‘কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে । আওয়ামী লীগের ছয় দফা কর্মসূচির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে ১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সংবাদ সম্মেলন করে ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। ছয় দফার ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান, ব্যাংক, শিল্প প্রতিষ্ঠানের জাতীয়করণ, বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিনেন্স বাতিলসহ সকল রাজবন্দীর মুক্তির দাবিতে এ কর্মসুচি ঘোষণা করা হয়।

গণ-অভ্যুত্থানের তাৎপর্য

পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থান ছিল স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। নিম্নে ৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থানের ফলাফল ও তাৎপর্য বর্ণনা করা হল।

১। গোলটেবিল বৈঠকের আহ্বান: ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানকে সামাল দেওয়ার জন্য আইয়ূব খান ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাওয়ালপিন্ডিতে সব দলের অংশ গ্রহণে এক গোলটেবিল বৈঠক আহ্বান করেন। উক্ত গোলটেবিল বৈঠকে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ঃ

ক) প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে।

খ) যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন পদ্ধতির প্রবর্তন করা হবে।

গ) মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার প্রবর্তন করা হবে।

২। আগরতলা মামলা প্রত্যাহার: ১৯৬৮ সালে শেখ মুজিবসহ ৩৫ জনকে আসামী করে যে ষড়যন্ত্রমূলক আগরতলা মামলা করা হয়। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের ফলে আইয়ুব খান সে মামলা প্রত্যাহার করে। বঙ্গবন্ধুসহ সকলকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন।

৩। আইয়ূব খানের পতন: ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে আইয়ূব সরকারের পতন ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইয়ূব খান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

8। ১৯৭০ সালের নির্বাচন: ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের ফলে পাকিস্তানের শাসন কাঠামো ভেঙে পড়ে। নতুন জান্তা সরকার ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচন করতে বাধ্য হয়। এতে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

৫। বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ: ১৯৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থান বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ গণ-অভ্যূত্থান ছিল বাঙ্গালির ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ফল। গ্রাম বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে পর্যন্ত ১৯৬৯ এর গণবিস্ফোরণের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে।

৬। বঙ্গবন্ধুর সম্মোহনী নেতৃত্ব: ১৯৬৯এর গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়েই শেখ মুজিবুর রহমান বাঙ্গালির অবিসংবাদিত নেতা হিসাবে আবির্ভূত হন। মুক্তি পাগল ছাত্র-জনতা শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে। বস্তুত ‘৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থান শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম ‘টার্নিং পয়েন্ট’। বাঙ্গালির স্বপ্নের বাহকে পরিণত হন তিনি।

৭। রাজনীতিতে ছাত্র সমাজের আবির্ভাব: বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের পর দীর্ঘদিন জাতীয় রাজনীতিতে ছাত্র সমাজের তেমন কোন ভূমিকা ছিল না। গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে ছাত্র সমাজ বিপ্লবী ভূমিকা নিয়ে আবির্ভূত হয়।

৭০ এর নির্বাচন

অশান্ত রাজনৈতিক পরিবেশে ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং সমগ্র পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করেন। জাতির উদ্দেশ্যে এক বেতার ভাষণে তিনি ১৯৭০ সালের ৫ই অক্টোবর সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে পাকিস্তানের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে ঘোষণা প্রদান করেন।
১৯৭০ এর নির্বাচন ও প্রতিদ্বন্দ্বি রাজনৈতিক দলসমূহ

জাতীয় পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর। প্রাদেশিক পরিষদসমূহের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯ ডিসেম্বর। অবশ্য পূর্ব পাকিস্তানের জলোচ্ছ্বাস-দুর্গত এলাকার আসনে ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ২৪টি রাজনৈতিক দল এবং বেশ কিছু স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। দলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আওয়ামী লীগ, পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পি.পি.পি) ন্যাপ (ওয়ালী খান), মুসলিম লীগের বিভিন্ন গ্রুপ, জামায়াত-ই ইসলামী, জমিয়তে উলামা-ই-ইসলাম, জমিয়তে উলা’মা-ই-পাকিস্তান, নিজামে ইসলাম, পাকিস্তান ডেমোক্রোটিক পার্টি (পি.ডি.পি) ইত্যাদি ।
নির্বাচনী ফলাফল

নির্বাচনী ফলাফলে দেখা যায, জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন (৭টি মহিলা আসনসহ) লাভ করে। বাকি দু’টি আসনের মধ্যে ১টি লাভ করে পিডিপি নেতা নুরুল আমীন এবং অপর আসনটি লাভ করেন নির্দলীয় প্রার্থী রাজা ত্রিদিব রায় চৌধুরী। জাতীয় পরিষদের ৩১৩টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন পেয়ে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান। এতে পশ্চিম পাকস্তানী শাসক চক্র বিপাকে পড়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ জাতীয় পরিষদে কোন আসন পায়নি। জাতীয় পরিষদে পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দকৃত ১৪৪টি আসনের মধ্যে ৮৮টি আসন লাভ করে ভূট্টোর পিপলস পার্টি। এছাড়া ৬টি আসন পায় ন্যাপ (ওয়ালী খান), ৯টি মুসলিম লীগ (কাইউম খান), ৭টি মুসলিম লীগ (কাউন্সিল), ২টি মুসলিম লীগ (কনভেনশন), ৭টি জমিয়তে উলামা-ই-পাকিস্তান, ৭টি জমিয়তে উলামায়-ই-ইসলাম, ৪টি জামায়াত-ই-ইসলামী এবং ১৩টি পায় নির্দলীয় প্রার্থী। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের নির্বাচনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল আওয়ামী লীগ পশ্চিম পাকিস্তানে ও পিপিপি পূর্ব পাকিস্তানে কোন আসন লাভ করতে পারেনি। স্পষ্টতই এ নির্বাচন ছিল অঞ্চলভিত্তিক। প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২৮৮টি আসন লাভ করে। প্রদত্ত ভোটের ৮৯ ভাগ পায় দলটি। বাকী ১২টি আসনের মধ্যে ৯টি স্বতন্ত্র প্রার্থীরা, ২টি পিডিপি এবং ১টি জামায়াত-ই-ইসলামী। আওয়ামী লীগ সংরক্ষিত ১০টি মহিলা আসন সহ নির্বাচনে ৩১০টি আসনের মধ্যে সর্বমোট ২৯৮টি আসন লাভ করে।
আওয়ামী লীগের বিজয়ের কারণ

নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অভাবনীয় সাফল্য লাভের পেছনে কতগুলো বিষয় গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। নিম্নে তা আলোচনা করা হল।

ছয় দফা প্রস্তাব: আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ছয় দফা ভিত্তিক দাবি পূর্ববাংলার জনসাধারণকে আকৃষ্ট করেছিল। ফলে নির্বাচনে জনসাধারণ আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে মূলত তাদের দাবির প্রতি সমর্থন দান করেছে।

৩। বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তি: জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগের বিজয়ের অন্যতম কারণ ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জাতীয়তাবাদী ভাবমূর্তি। বাঙ্গালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু নেতৃত্বে ছিলেন সংগ্রামী ও আপোষহীন। আর এ কারণে ১৯৭০ এর অগ্নিগর্ভ সময়ে বাঙ্গালি এক বাক্যে মুজিবের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।

ভাসানীর নির্বাচন বর্জন: পূর্ব বাংলার একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল ন্যাপ (ভাসানী) নির্বাচন বর্জন করেছিল ‘ভোটের আগে ভাত চাই’ শ্লোগানে। কাজেই পূর্ব বাংলায় ন্যাপ নির্বাচন বর্জন করায় আওয়ামী লীগের শক্ত কোন প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলো না।

৫। মুসলিম লীগের জনবিচ্ছিন্নতা: ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে গণ স্বার্থ বিরোধী ভূমিকার কারণে দলটি পূর্ব বাংলায় জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। নির্বাচনে মুসলিম লীগের অকল্পনীয় ভরাডুবি আওয়ামী লীগের বিজয়ের আরেকটি কারণ।

১৯৭০ এর নির্বাচনের গুরুত্ব

পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭০ এর নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম। এর ফলে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী বিপাকে পড়ে যায়। শেখ মুজিব তথা বাঙ্গালির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর ছাড়া আর কোন পথ খোলা ছিল না। নিম্নে ১৯৭০ এর নির্বাচনের গুরুত্ব বর্ণনা করা হল।

(১) নির্বাচনের মধ্যদিয়ে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের জয় হয়েছে। কারণ আওয়ামী লীগের বিজয় ছিল বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদেরই বিজয়।

(২) জনগণ ছয়দফা প্রশ্নে আওয়ামী লীগকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। নির্বাচনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগের ছয় দফা থেকে সরে আসার পথ খোলা ছিল না।

(৩) এই নির্বাচনের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যায়, পাকিস্তান ভৌগোলিক কারণে কার্যত বিভক্ত হয়ে পড়েছে। কেননা পাকিস্তানের কোন রাজনৈতিক দল বা নেতার পাকিস্তানের দু’অংশে গ্রহণযোগ্যতা ছিল না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top