বাংলাদেশে উৎপাদিত পণ্যের উপর ভিত্তি করে শিল্পের শ্রেণিবিন্যাস কর। দ্রুত শিপ্লোন্নয়নে কোন ধরণের শিল্প স্থাপন করা যুক্তিযুক্ত- মতামত দাও

শিল্পকে উৎপাদনের বাহন হিসেবে বিবেচনা করা হয় । যে প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ, কাচামালে রূপদান এবং প্রক্রিয়াজাতকরনের মাধ্যমে কাচামালকে মানুষের ব্যবহার উপযোগী পণ্যে পরিণত করা হয় তাকে শিল্প বলা হয়।

বাংলাদেশের শিল্পের শ্রেণীবিন্যাস

উৎপন্ন দ্রব্য প্রকৃতি অনুযায়ী বাংলাদেশের শিল্পখাত তিন ভাগে বিভক্ত। যথা-

  • ১। ভোগ্যপণ্য শিল্প
  • ২। মধ্যবর্তী পণ্যের শিল্প এবং
  • ৩। মূলধন দ্রব্যের শিল্প।

শিল্পনীতি ২০০৫ এর আলোকে বাংলাদেশের শিল্পসমূহ প্রধানত চার ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-

  • ১। বৃহৎ শিল্প
  • ২। মাঝারি শিল্প
  • ৩। ক্ষুদ্র শিল্প এবং
  • ৪। কুটির শিল্প

দেশের শিল্পায়নের গতিকে বেগবান করতে ‘শিল্পনীতি ২০১০’ নামে একটি যুগোপযোগী শিল্পনীতি ঘোষণা করা হয়েছে। এ নীতির অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য গুলো হচ্ছে- উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, নারীদেরকে শিল্পায়ন প্রক্রিয়ার মূলধারায় নিয়ে আসা এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ। এ উদ্দেশ্যে যেখানে সম্ভব সেখানে পুঁজিঘন শিল্পের পরিবর্তে শ্রমঘন শিল্প স্থাপনকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে শিল্পনীতিতে নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ সহ কুটির শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রসারের কার্যক্রম গ্রহণ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নে জমি ও অর্থায়ন এবং ব্যবসায় সহায়তামূলক সেবা লাভের ক্ষেত্রে নারীদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার পদক্ষেপ শিল্পনীতিতে বিধৃত হয়েছে। মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পের প্রসারে উৎসাহ প্রদানকল্পে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সমূহের মাধ্যমে শিল্পঋণ বিতরণ ও অন্যান্য সহযোগিতা প্রদানের প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে।

১। বৃহৎ শিল্পঃ

ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্রে বৃহৎ শিল্প বলতে যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বোঝাবে যেসব প্রতিষ্ঠান জমি এবং কারখানা ভবন ব্যতীত স্থায়ী সম্পদের মূল্য প্রতিস্থাপন ব্যায়সহ (Replacement cost) ৫০ কোটি টাকার অধিক কিংবা তৈরি পোশাক/শ্রমঘন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ব্যতীত যে সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের 300 জনের অধিক শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছে। যে সকল তৈরি পোশাক/শ্রমঘন শিল্প প্রতিষ্ঠান ব্যাতীত যেসব শ্রমিকের সংখ্যা ১০০০ এর অধিক কেবল সে সকল তৈরি পোশাক শিল্প বৃহৎ শিল্পের অন্তর্ভুক্ত হবে। সেবা শিল্পের ক্ষেত্রে ‘বৃহৎ শিল্প’ বলতে সেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বোঝাবে যেসব প্রতিষ্ঠানে জমি এবং কারখানা ভবন ব্যতিরেকে স্থায়ী সম্পদের মূল্য প্রতিস্থাপন ব্যায়সহ 3০ কোটি টাকার অধিক কিংবা যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের 120 জনের অধিক শ্রমিক নিযুক্ত রয়েছে।

২। মাঝারি শিল্পঃ

ম্যানুফ্যাকচারিং এর ক্ষেত্রে ‘মাঝারি শিল্প'(Medium Industry) বলতে সেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বোঝাবে যেসব প্রতিষ্ঠান জমি এবং কারখানা ভবন ব্যতিরেকে স্থায়ী সম্পদের মূল্য প্রতিস্থাপন ব্যয়সহ 15 কোটি টাকার অধিক এবং অনধিক 50 কোটি টাকা কিংবা যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে 121- 300 জন শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছে। তবে তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান/শ্রমঘন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মাঝারি শিল্পে শ্রমিকের সংখ্যা সর্বোচ্চ 1,000 জন।

সেবার শিল্পের ক্ষেত্রে ‘মাঝারি শিল্প’ বলতে সেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বোঝাবে যেসব প্রতিষ্ঠান জমি এবং কারখানা ভবন ব্যাতীত স্থায়ী সম্পদের মূল্য প্রতিস্থাপন ব্যয়সহ ২ কোটি টাকা থেকে 30 কোটি টাকা পর্যন্ত কিংবা যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের 51- 120 জন শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছে। কোন একটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে একটি কর্মকাণ্ড মাঝারি শিল্পের অন্তর্ভুক্ত হলেও অন্য মানদণ্ডে সেটি বৃহৎ শিল্পের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে এ কর্মকাণ্ডটি বৃহৎ শিল্পের অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচিত হবে। তবে তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান/শ্রমঘন শিল্পের ক্ষেত্রে এ বিধান প্রযোজ্য হবে না।

৩। ক্ষুদ্র শিল্পঃ

মেনুফেকচারিং এর ক্ষেত্রে ‘ক্ষুদ্র শিল্প'(Small Industry) বলতে সেসব শিল্প প্রতিষ্ঠানকে বোঝাবে যেসব প্রতিষ্ঠানে জমি এবং কারখানা ভবন ব্যতিরেকে স্থায়ী সম্পদের মূল্য প্রতিস্থাপন ব্যয়সহ ৭৫ লক্ষ টাকা থেকে ১৫ কোটি টাকা কিংবা যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠানে ৩১-১২০ জন শ্রমিক কাজ করে।

সেবা শিল্পের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র শিল্প বলতে সেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বোঝাবে যেসব প্রতিষ্ঠান জমি এবং কারখানা ভবন ব্যতিরেকে স্থায়ী সম্পদের মূল্য প্রতিস্থাপন ব্যয় 10 লক্ষ টাকা থেকে 2 কোটি টাকা কিংবা যে সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে 16-50 জন শ্রমিক কাজ করে। কোন একটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে একটি কর্মকাণ্ড ক্ষুদ্র শিল্পের অন্তর্ভুক্ত হলেও অন্য মানদণ্ডে সেটি মাঝারি শিল্পের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে সে ক্ষেত্রে কর্মকাণ্ডটি মাঝারি শিল্পের অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচিত হবে। তবে তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান /শ্রমঘন শিল্পের ক্ষেত্রে এ বিধান প্রযোজ্য হবে না।

৪। কুটির শিল্পঃ

‘কুটির শিল্প’ (Cottage Industry) বলতে পরিবারের সদস্যদের প্রাধান্যভুক্ত সেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বোঝাবে যেসব প্রতিষ্ঠানে জমি এবং কারখানা ভবন ব্যতীত স্থায়ী সম্পদের মূল্য প্রতিস্থাপন ব্যয়সহ 10 লক্ষ টাকার নিচে এবং যা পরিবারিক সদস্যসহ অন্যান্য সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত এবং সর্বোচ্চ জনবল 15 এর অধিক নয়।

রপ্তানিমুখী শিল্পের তালিকা প্রস্তুত করণ

সম্পূর্ণরূপে বিদেশের বাজারে রপ্তানির উদ্দেশ্যে দেশে যে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে বা রপ্তানির উদ্দেশ্যে শিল্পায়নেকে রপ্তানিমুখী শিল্প বলে। যে সকল দেশের আমদানি ব্যয় অপেক্ষা রপ্তানি আয় অধিক অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত থাকে, সে সকল দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী ভিত এর উপর প্রতিষ্ঠিত।

একটি দেশ যদি ক্রমাগত দীর্ঘকালব্যাপী বাণিজ্য যুদ্ধ ভোগ করে, তখন সে দেশকে দরিদ্র উন্নয়নশীল দেশ না বলে, উন্নত দেশ বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত।গত দুই দশকে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের তুলনামূলক চিত্র নিম্নে উপস্থাপন করা হলোঃ

২০১৬-১৭ অর্থবছরে তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল১৪৩৯৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং নিটওয়্যার রপ্তানির পরিমাণ ছিল১৩৭৫৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ দুটিহাত মোট রপ্তানি আয়ের ৮১.২৩ শতাংশ।

সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বের শিল্পোন্নয়নে সরকারি নীতি

শিল্পায়নের সরকারি নীতিঃ

শিল্প খাত ও শিল্পায়নের সাধের রাষ্ট্র ব্যক্তির সম্পর্ক কিরূপ, দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের সাথে শিল্প কীভাবে সম্পর্কিত এ সংক্রান্ত সরকারি নীতিমালাকে শিল্পনীতি বলা হয়। শিল্পনীতিতে অন্তর্ভুক্ত থাকে- কাঁচামালের ধরন, সরকারি ও বেসরকারি খাতের অবস্থানের ধরন ও ভূমিকা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উপায়, আমদানি বিকল্প নাকি রপ্তানিমুখী শিল্প, সংরক্ষিত ও উন্মুক্ত শিল্পের তালিকা, শিল্পের আঞ্চলিক বন্টন, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে ভিত্তি, প্রবৃদ্ধি অর্জনের উপায় ইত্যাদি। স্বাধীনতার পর বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশে আটটি শিল্পনীতি প্রণীত হয়েছে। যেমনঃ

১. শিল্পনীতি ১৯৭৩ঃ

মূল বৈশিষ্ট্যঃ জাতীয়করণ আমদানি বিকল্প শিল্প নীতি গ্রহণ। তবে এ নীতি ১৯৭৪ সালের সংশোধিত, ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের পর সমাজতন্ত্রের ধনতান্ত্রিক ১৯৭৮ সালের বেসরকারি খাতে শিল্প স্থাপনের সীমা তুলে দেওয়া হয় এবং আর কোন শিল্প জাতীয়করণ করা হবে না মর্মে ঘোষণা দেওয়া হয়। তখন হতে বেসরকারি বৈদেশিক বিনিয়োগ কে উৎসাহ দেওয়া হয় এবং শেয়ার মার্কেট চালু করা হয়।

২. শিল্পনীতি ১৯৮২ঃ

মূল বৈশিষ্ট্যঃ বেসরকারিকরণ, উদারীকরণ এবং বিশ্বায়ন রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকে দ্রুত বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া, বেসরকারি বিনিয়োগের বিধিনিষেধ তুলে দেওয়া এবং আমদানি নীতি উদারীকরণই হলো শিল্পনীতি মূলভিত্তি।

৩. শিল্পনীতি -১৯৮৬ঃ

মূল বৈশিষ্ট্যঃ মাত্র ৭টি মৌলিক ও ভারী শিল্প ছাড়া অন্য সকল শিল্পকে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে হোল্ডিং কোম্পানি তে পরিণত করার জন্য ৪৯%শেয়ার শ্রমিক বা জনগণের মাঝে বিক্রয় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

৪. শিল্পনীতি ১৯৯১ঃ

মূল বৈশিষ্ট্যঃ বেসরকারিকরণ ও উদারীকরণ নীতি মালা আরো সহজ, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান যৌথ মালিকানায় স্থানান্তরের মাধ্যমে পরবর্তীতে বেসরকারিকরণ এবং সরকারি-বেসরকারি শিল্প-কারখানায় সমান সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

৫. শিল্পনীতি ১৯৯৯ঃ

মূল বৈশিষ্ট্যঃ শিল্পনীতি 5 বছর মেয়াদী,GDP শিল্প খাতের অবদান২৫%এ উন্নতিকরণ এবং শিল্প কারখানা মহিলাদের অধিক নিয়োগের লক্ষ্যে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

৬.শিল্পনীতি ২০০৫ঃ

মূল বৈশিষ্ট্যঃ পূর্বাব্যাখ্যা এর আওতা প্রসারিত হয়। অলাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানায় বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠা, স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারের মাধ্যমে কারখানাস্থাপন, তৈরি পোশাক শিল্পকে অগ্রাধিকার খাত বিবেচনা, আমদানি বিকল্প শিল্প স্থাপন,উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধি ও বহুমুখীকরণে উপর গুরুত্ব প্রদান, কৃষি নির্ভর শিল্প স্থাপন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পুঁজিবাজার উন্নয়ন শিল্প সংক্রান্ত তথ্য কেন্দ্র স্থাপন।

৭.শিল্পনীতি ২০১০

মূল বৈশিষ্ট্যঃ অর্থনীতির আধুনিকায়ন ও অবকাঠামোগত রূপান্তর, অর্থনৈতিক ভিত্তির বৈচিত্রায়ন, ক্রমবর্ধমান উৎপাদনশীলতা অর্জন, বাহ্যিক ব্যয় সংকোচন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ইত্যাদি হচ্ছে শিল্প উন্নয়নের সর্বজনস্বীকৃত নির্ধায়ক।

৮.শিল্পনীতি ২০১৬

সরকারি ও ব্যক্তি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টায় টেকসই শিল্প প্রবৃদ্ধি অর্জন ও ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে জনগণের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন। ২০২১ সাল নাগাদ জাতীয় আয়ে শিল্প খাতের অবদান 29 তারিখ হতে 35 শতাংশে উন্নীতকরণ করা এবং শ্রম শক্তির নিয়োগ 18 হতে 25 উন্নীতকরণ তথ্য প্রযুক্তির প্রসার এবং নারী উদ্যোক্তাদের অধিকতর অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি। আমদানি নির্ভরশীলতা হ্রাস এবং টেকসই শিল্পায়নের লক্ষ্যে দেশজ উপকরণ এর প্রাপ্যতা ও ব্যবহার বৃদ্ধি এবং পণ্য বহুমুখীকরণ এর মাধ্যমে আয় বৃদ্ধি ও জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন, পরিবেশ ও ভোক্তাবান্ধব শিল্পের বিকাশ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top