তুমি আত্মমর্যাদাবান ও আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে। নিজেকে কীভাবে গড়ে তুলতে পারাে তার একটি কর্ম পরিকল্পনা প্রণয়ন কর।

আমরা নিজের সম্পর্কে যে বিচার , মতামত, মূল্যায়ন করি সেটাই হলো আত্মমর্যাদা। অন্যভাবে বললে , আমাদের সম্পর্কে নিজের যে আবেগীয় মূল্যায়ন এবং নিজের প্রতি নিজের যে দৃষ্টিভঙ্গি , নিজের প্রতি নিজের অনুভূতি , সেটাই হলো আত্মসম্মান বা আত্মমর্যাদা। স্মিথ ত্যান্ড ম্যাকলের (২০০৭ ) মতে , আমরা নিজের সম্পর্কে যা কিছু মনে করি , সেটাই হলো আত্মমর্যাদা।

আত্মমর্ধাদা কিভাবে তৈরি হয় : আত্মসম্মান সারাজীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে তৈরি হয়। অতীত অভিজ্ঞতাগুলো ষদি ইতিবাচক হয় , তাহলে আপনার মধ্যে উচ্চ আত্মসম্মানবোধ তৈরি হবে। আর যদি নেতিবাচক হয় , তাহলে নিম্ন ত্মসম্মানবোধ তৈরি হবে । অতীত এবং বর্তমান জীবনের সব আত্তঃব্যক্তিক সম্পর্কগুলোও আত্মসম্মান তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । যদি আপনার প্রতিটি সম্পর্ক আত্মসম্মানবোধ বেড়ে ঘাবে। জীবনে যত মানুষের সাথে দেখা হয়েছে , সবাই হয় আপনার আত্মসম্মানবোধ বাড়িয়ে দিয়েছে: না হয় কমিয়ে দিয়েছে। তবে আত্মসম্মানবোধ সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন হতে পারে।

আত্মমর্ধাদার প্রকারভেদ : সাধারণত তিন রকমের আত্মমর্ষাদাবোধ দেখা যায়। একই ব্যক্তির মধ্যে সময়ের পরিক্রমায় আত্মসম্মানের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যেতে পারে।

স্ফীত আত্মসম্মানবোধ: নিজের সম্মানকে খুব ফুলিয়ে ফাপিয়ে প্রকাশ করেন। যতটা না, তার চেয়েও বেশি সে প্রকাশ করেন বিভিন্ন আচরণের মাধ্যমে। তারা মনে করেন, অন্যদের চেয়ে অনেক ভালো, অনেক সম্মানিত এবং অনেক উপরে। তাই তারা আশেপাশের সবাইকে খুবই অবমূল্যায়ন করতে পিছপা হন না। এটি খুবই নেতিবাচক আত্মসম্মানবোধ। যেহেতু এর জন্য ব্যক্তি অন্যদের সাথে স্নেহময় এবং সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারেন না। তারা সব সময় যেকোনো প্রতিযোগিতায় উপস্থিত থাকেন এবং যেকোনো মূল্যে সর্বদা শীর্ষে আসতে চান। সফলতাই তাদের কাছে সুখ। তাই যেকোনো মূল্যে অন্যকে খাটো করে, অন্যের ক্ষতি করে তারা সফল হতে চান। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এরকম মনোভাবের কারণে তারা সত্যিকার অর্থে সুখী হন না।

উচ্চ আত্মসম্মানবোধ : উচ্চ আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি যেমনই হোক , নিজেকে গ্রহণ করেন এবং নিজেকে মুল্য দেন। এটি ইতিবাচক আত্মুসম্মান। যেখানে ব্যক্তি নিজের জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন। তাদের জীবনে যে বাধা -বিপত্তিগুলো আসে , সেটা তারা নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস ও সাহস দিয়ে মোকাবিলা করে সামনে এগিয়ে যান। আত্মমর্যাদা বাড়ানোর উপায় : যদিও আত্মমর্ধাদাবোধ ছোটবেলা থেকেই গড়ে ওঠে।

নিচু আত্মমর্যাদা: উচ্চ আত্মমর্যাদার পুরোপুরি বিপরীত হলো নিচু আত্মমর্যাদা। নিজেরাই নিজেদের প্রতি আস্থা রাখতে পারেন না, নিজেকে মূল্যহীন মনে করেন। নিজেদের সামর্থের উপর নির্ভর করতে পারেন না। সব সময় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। কোনো কাজ শুরু করার আগেই ব্যর্থতার ভয় পেয়ে বসে। তারাই মূলত অসুখী মানুষের মডেল।

আত্মবিশ্বাস ও কম আত্মবিশ্বাসী মানুষের মধ্যে কিছু পার্থক্য বিদ্যমান। নিম্নে কিছু পার্থক্য তুলে ধরা হলো –

আত্মবিশ্বাসী মানুষ:

১) নিজে কোনো ভুল করলে তা স্বীকার করে এবং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।

২) পরিবর্তনের কথা শুনে ভয় পেয়ে যায় না; সম্ভব হলে অংশগ্রহণ করে।

৩) সবসময় নিত্য নতুন ভালো কাজে অংশ নিতে প্রস্তুত থাকে এবং সুযোগ পেলেই কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

৪) অন্যের কথা শুনেই প্রভাবিত হয় না। আগে তা বুঝে, ভেবে তারপর সিদ্ধান্ত নেয় বা কাজ করে।

৫) ঝুঁকি নিতে ভয় পায় না, বরং ঝুঁকি থাকলে খুব সাবধানী হয়ে সামনে এগিয়ে যায়।

৬) যারা আত্মবিশ্বাসী তারা অন্যের কথা বা মতামতকে মূল্যায়ন করে; সবার সাথে বিনয়ী আচরণ করে।

কম আত্মবিশ্বাসী মানুষ:

১) নিজের ভুল স্বীকার করতে ভয় পায়, সবসময় ভুলগুলোকে ঢেকে রাখতে চায়।

২) যে কোনো পরিবর্তনের কথা শুনেই ভয় পেয়ে যায়।

৩) নতুন কিছু করতে ভয় পায়, কোনো কাজে অংশ নিতেও ভয় পায়।

৪) অন্যরা যা বলে তা-ই বিশ্বাস করে। সত্য-মিথ্যা যাচাই করে না, ভেবে -চিন্তেও দেখে না।

আত্মমর্যাদা বাড়ানোর উপায়

যদিও আত্মমর্যাদাবোধ ছোটবেলা থেকেই গড়ে ওঠে। তবুও নিন্মোক্ত উপায়গুলোর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি আত্মমর্যাদা বাড়াতে চেষ্টা করতে পারেন:

১. যে বিষয়গুলো আপনি ভয় পান বা ভয়ের কারণে করা থেকে দুরে থাকেন, প্রথমেই সেই ভয়গুলোকে দূর করুন৷ ভয়গুলোকে আকাশের তারায় পরিণত করুন। যাতে সেটা থেকে দুরে না গিয়ে সেগুলো সাথে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারেন। একটি কাজ আগে করার অভিজ্ঞতা থাকুক বা না থাকুক , সুযোগ পেলে সেটি করার চেষ্টা করুন। সফল না হলেও অভিজ্ঞতার খাতায় সেটিই যোগ করুন। ব্যর্থতাকে স্বাগত জানান , পরবর্তীতে উন্নতির জন্য।

২. বুদ্ধিমত্তার সাথে যেটা পারবেন না, বা যেটা করা সম্ভব নয় সেটা এড়িয়ে চলুন । সব কাজ সবার জন্য নয়। একজন মানুষ সব কাজ করতে পারে না। যখন আপনি সহজেই নিশ্চিত হবেন, কোনো একটি বিষয় পুরোপুরি আপনার আয়ন্তের বাইরে , সেটি এড়িয়ে যাওয়া উত্তম।

৩. পৃথিবীতে অন্যের জন্য যা -ই কিছু করেন না কেন, সেটির একটি বিনিময় আশা করেন। আপনার কোনো বন্ধুর বিপদে সহযোগিতা করলে ভাবতই আপনার বিপদে তার সহযোগিতা আশা করবেনই। কিন্তু আত্মমর্যাদার উন্নয়নে মাঝে মাঝে মানুষের জন্য বিনিময় প্রত্যাশা না করে কিছু করুন মনে প্রশান্তি আসবে।

৪. কেউ আপনার জন্য ছোটখাটো কোনো উপকার করলেও তাকে ধন্যবাদ দিন। হতে পারে কাজটি ব্যক্তি কর্তব্য বা দায়িত্ব ছিল আপনার জন্য করার। তবুও তাকে ধন্যবাদ দিন, অভিনন্দন জানান। একইভাবে , কোনো কিছুর জন্য কেউ আপনাকে অভিনন্দন বা ধন্যবাদ জানালে , সেটি হাসিমুখে গ্রহণ করুন| এটি মানব চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক।

৫. একজন ব্যক্তি হিসেবে , পেশাজীবী হিসেবে আপনার দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে গ্রহণ করুন এবং তা করতে আন্তরিক হন। কোনো সহযোগিতা লাগলে সেটির জন্য জিজ্ঞেস করুন।

৬. নিজের জীবন্র সঠিক, বাস্তবিক এবং অর্জনযোগ্য লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ঠিক করুন যত বাধাই আসুক , আপনার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের দিকে ধাবিত হোন পাখির চোখের মত অন্যের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে ষ-উদ্যোগী হয়ে নিজেকে চালিত করুন।

৭.নিজেকে সব সময় ইতিবাচক অটো সাজেশন দিন | আমি পারবো , আমার দ্বারা সম্ভব , সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে’ এরকম মন – মানসিকতা ধারণ করুন।

৮. ঘত বিপদই আসুক , আঘাত আসুক , ধৈর্য ধারণ করুন। নিজের রাগকে ইতিবাচকভাবে প্রকাশ করুন। আপনার সময় আসবেই।

৯. আপনার ভালো দিকগুলো এবং ষেসব দিক উন্নতি করতে হবে , সেগুলো সব আলাদা করে তালিকা করুন। আপনার ভালো দিকগুলো বেশি বেশি অনুশীলন করুন , কাজে লাগান এবং উন্নতির দিকগুলো উন্নয়নে উদ্যোগী হোন।

১০. ইতিবাচক থাকুন। নিজের অধিকার , মতামত , অনুভূতিগুলো প্রকাশ করুন অন্যের অধিকার , মতামত এবং অনুভূতিগুলোকে অবজ্ঞা , অশ্রদ্ধা নাকরে। ‘ না বলার দরকার হলে অন্যকে আঘাত না করে ‘ না’ বলুন । পাশাপাশি অন্যের মতামত , অনুভূতি এবং আবেগকে মূল্য দিতে গিয়ে নিজেকে কষ্ট দেবেন না। তুমিও ঠিক, আমিও ঠিক – এরকম চিন্তা – ভাবনা ধারণ করুন।

১১.নিজের সম্পর্কে নিজের নেতিবাচক চিন্তা বা ধারণাগুলো লিপিবদ্ধ করুন। এরপর সেগুলোকে চ্যালেঞ্জ করুন । আপনার সেই ধারণার পক্ষে বেশিরভাগ সময়ই কোনো প্রমাণ পাবেন না। তাই নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা ত্যাগ করুন।

১২. ইতিবাচক আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের উন্নয়ন করুন। সম্পর্কের মধ্যে যথাষথ সীমানা নির্ধারণ করুন। সম্পর্কের মধ্যে ব্যক্তিগত সীমানা অতিক্রম করবেন না। আপনার আশেপাশে যারা আপনাকে খারাপ অনুভব করতে বাধ্য করে , তাদের পরিত্যাগ করুন। যাদের সান্নিধ্যে আপনি আত্মবিশ্বাস অনুভব করেন , তাদের সাথে বেশি সময় কাটান। নীতিবান এবং আদর্শবান রোল মডেলদের অনুকরণ করুন।

১৩. নিজের জীবনের অতীত ভুলগুলোর জন্য নিজেকে ক্ষমা করে দিন। অন্যরা কী মনে করবে? ‘ এমন চিন্তা বন্ধ করুন। যদি তা-ই করেন , তাহলে আপনি নিশ্চিন্তে কোনো কাজ করতে পারবেন না। নিজের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হোন যে , অন্য মানুষ যা -ই চিন্তা করুক; সেটি নিয়ে আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না। আপনি কী করতে চাচ্ছেন, সেটাই করুন। অন্যরা কী চিন্তা করবে , সেটা না।

সবশেষ বলা যায়, নিজে যেমনই হোন না কেন, ছোট মনে করবেন না , নিচে নামাবেন না। প্রতিটি মানুষের আলাদা কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। নিজেকে অন্য কারো সাথে অহেতুক তুলনা করবেন না। আপনার তুলনা শুধুই আপনি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top