চাহিদা এবং যােগান বিধির প্রেক্ষিতে ভারসাম্য দাম নির্ধারণ এবং দামের ওঠা নামার চাহিদা ও যােগানের পরিবর্তন নির্ণয়

চাহিদা ও যোগানের ধারণা

অর্থনীতির ভাষায় চাহিদা এবং যোগান বলতে কোন একটি পণ্যের বা সেবার ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে বিদ্যমান বাজার সম্পর্ক বোঝায়। বাজারে কোন পণ্যের দাম এবং সরবরাহ কী-রূপ হবে তা চাহিদা ও যোগানের মধ্যে বিরাজমান সম্পর্ক দ্বারাই নির্ধারিত হয়।

ব্যষ্টিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে এটি একটি মৌলিক সম্পর্ক এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক অবস্থার ব্যাখ্যার পাশাপাশি নতুন নতুন তত্ব তৈরির ক্ষেত্রেও এটি প্রায় সর্বদা ব্যবহৃত হয়। আন্টোনিও অগাস্টিন কর্নো এটি সর্বপ্রথম বর্ণনা করেন এবং আলফ্রেড মার্শাল এটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন। এই মডেল এর মতে একটি মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পণ্যের প্রকৃত বিক্রয় মুল্যই জেতার চাহিদা এবং বিক্রেতার সরবরাহের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে এবং একটি সাম্যাবস্থা প্রতিষ্ঠা করে।

‘যোগান ও চাহিদা” শব্দগুচ সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন জেমস ডানহ্যাম সৃটুয়ার্ট তার ১৭৬৭ প্রকাশিত রাজনৈতিক অর্থনীতির কার্যকারন অনুসন্ধান বইটিতে। ১৭৭৬ সালে অ্যাডাম স্মিথ তার সালে তার জাতিসমূহের সম্পদ বইটিতে এবং ডেভিড রিকার্ডো তার রাজনৈতিক অর্থনীতির কার্যকারন ও করারোপ বইটিতেও এই শব্দ ব্যবহার করেন।

“জাতিসতক সম্পদ’ বইটিতে স্মিথ ধরে নিয়েছিলেন যে সরবরাহ মূল্য সর্বদা স্থির থাকবে এবং দাম কমলে বা বাড়লে চাহিদা বাড়বে বা কমবে। রিকার্ডো তার ধারণাগুলো প্রকাশ করার সময় এই অনুমানগুলোর উপর আর অধিক জোর দিয়েছিলেন। ১৮৩৮ সালে সম্পদের গাণিতিক বিধিমালা সংক্রান্ত গবেষণা প্রবন্ধে তিনি চাহিদা ও যোগানের মধ্যে একটি গাণিতিক সম্পর্ক দাঁড় করান।

উনিশ শতকের শেষদিকে প্রান্তিক(marginalist) চিন্তাধারার সূচনা ঘটে। স্ট্যনলি জেভ, কার্ল মেঞ্জার ও লিও ওয়ালস এই বিষয়টির সুচনা করেন। মুল ধারণাটি ছিলো এই ষে, মূল্য নির্ধারিত হয় সর্বাধিক মূল্য দ্বারাআর এটাই প্রান্তিক মূল্য। আযাডাম স্মিথ যে ধারণা করেছিলেন যে মুল্য নির্ধারিত হয় সরবরাহ মুল্য থেকে, তার থেকে এটা ছিল অনেকদূর সরে আসা।

১৮৯০ সালে আলফ্রেড মার্শাল রচিত অর্থনীতির কার্যকারণ গ্রন্থটিতে এই ধারণাটি আরো উন্নতি লাভ করে। লিও ওয়ালস এর সাথে মার্শালও একটি সাম্যাবস্থার খোজকরতে থাকেন যেখানে চাহিদা ও যোগান রেখা দুটি মিলিত হবে। তারা বাজারের ওপর এদের প্রভাবও বোঝার চেষ্টা করলেন। উনিশ শতকের শেষ থেকেই চাহিদা ও যোগানের এই সম্পর্কগুলো মোটামুটি অপরিবর্তিত রয়েছে। আর অধিকাংশ গবেষনায় হয়েছে এদের ব্যতিক্রমগুলোকে পর্যালোচনা করা নিয়ে।

চাহিদাবিধি ও যোগানবিধি

চাহিদাবিধি: চাহিদার সঙ্গে দামের সম্পর্ককে চাহিদা বিধি বলে। চাহিদা বিধি বা সূত্র বলতে আমরা বুঝি অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থেকে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে পণ্যের দাম কমলে তার চাহিদার পরিমাণ বাড়ে এবং দাম বাড়লে চাহিদার পরিমাণ কমে। অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে, ক্রেতার রুচি, অভ্যাস ও পছন্দের কোনো পরিবর্তন হবে না এবং ক্রেতার আয় বিকল্প দ্রব্যের দাম অপরিবর্তিত থাকবে ইত্যাদি।

যোগানবিধি: দাম ও যোগানের সম্পর্ককে যোগান বিধি বলে আমরা প্রতিনিয়ত বাজারে জিনিসপত্র ক্রয়-বিক্রয় করে থাকি। একজন বিক্রেতা তখনই দ্রব্যটি বিক্রয় করতে আগ্রহী হবেন, যখন বাজারে এর দাম সবচেয়ে বেশি।

ভারসাম্য অবস্থা: ভারসাম্য শব্দটি পদার্থ বিজ্ঞানের একটি বিষয় হলেও অর্থনীতিতে ভারসাম্য শব্দটির অর্থনৈতিক ব্যবহার হয়ে থাকে। অর্থনীতির প্রায় সব ক্ষেত্রেই ভারসাম্য ধারণাটি ব্যবহৃত হয়। অর্থনীতিতে ভারসাম্য আসলে অর্থনৈতিক মডেলের ভারসাম্য বুঝায়। যেমন: কোনো ভোক্তার ভারসাম্য, উৎপাদকের ভারসাম্য ইত্যাদি।

ভারসাম্য: ভারসাম্য অর্থ স্থিতাবস্থা বা সাম্য অবস্থা। ভারসাম্য বলতে অর্থনৈতিক মডেলের এমন একটি অবস্থা বুঝায়, যে অবস্থায় মডেলের অর্থনৈতিক চলকগুলো এমন একটি স্থির মানে উপনীত হয়, যেখানে মানগুলো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মডেলের নিজ কোনো প্রবণতা থাকে না।

ভারসাম্য দাম: যে কোনো দ্রব্য বা সেবা সামগ্রীর জন্য একটি নিরিষ্ট সময়ে যে দামে চাহিদা
ও যোগানের পরিমাণ সমান হয়, তাকে ভারসাম্য দাম বলা হয়।

ভারসাম্য পরিমাণ: একটি নির্দিষ্ট সময়ে যে পরিমাণ দ্রব্যের ক্ষেত্রে চাহিদা দাম ও যোগান দাম সমান হয়, তাকে ভারসাম্য পরিমাণ বলা হয়।

উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে চাহিদা ও যোগানের সমতা বিন্দুতে বাজার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। যে দামে বাজারে কোনো একটি দ্রব্যের মোট চাহিদা ও মোট যোগান পরস্পরের সমান হয়, তা-ই বাজারের ভারসাম্য অবস্থা। ভারসাম্য অবস্থা ক্রেতা ও বিক্রেতার জন্য গ্রহণযোগ্য দাম ও পরিমাণ নির্ধারিত হয়।

দামের ওঠা-নামায় চাহিদা ও যোগানের পরিমাণ: চাহিদা ও যোগান বিশ্লেষনে দাম দ্রব্য বিনিময়ের ঘর) উৎপাদন ও ভোগের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে। দাম ও পরিমাণকে বাজার ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য সবচাইতে বেশি প্রতক্ষ চলক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যোগান, চাহিদা ও বাজার ভারসাম্য তত্তভাবে দাম ও দ্রব্যের পরিমাণের সহিত সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু দাম ও চাহিদা পরিবর্তনের পরিমাপে উপাদানের প্রভাব নির্ণয় করা হয়-_তাদের মাধ্যমে, দাম ও পরিমাণ ফলিত ব্যষ্টিক অর্থনীতি ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে আদর্শ চলক হিসেবে। ব্যবহার করা হয়। অর্থনৈতিক তত্বসমুহ বিদ্যমান পরিমাণে দাম কি হবে তা নির্ধারণ করে। বাস্তবিকপক্ষে, দাম ও পরিমাণের পরিবর্তনের ফলে যোগান ও চাহিদা কতটুকু পরিবর্তন হবে তা নির্ণয় করার চেষ্টা করা হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top