খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনের প্রকৃতি এবং ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব ও এর বৈশিষ্ট্য নিরূপণ।

খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনের প্রকৃতি এবং ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব ও এর বৈশিষ্ট্য নিরূপণ।

নির্দেশন :

খিলাফত আন্দোলনের প্রকৃতি ব্যাখ্যা।

অসহযোগ আন্দোলনের প্রকৃতি ব্যাখ্যা।

খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনের ফলাফল বিশ্লেষণ।

লাহোর প্রস্তাবের প্রেক্ষাপট ও বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা।

খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনের প্রকৃতি এবং ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব ও এর বৈশিষ্ট্য নিরূপণ।

নমুনা সমাধান

(ক)
খিলাফত আন্দোলনের প্রকৃতি : ভারতের মুসলমানেরা তুরস্কের সুলতানকে মুসলিম বিশ্বের খলিফা বা ধর্মীয় নেতা বলে শ্রদ্ধা করতেন। কিন্তু তুরস্কের সুলতান ব্রিটিশবিরোধী শক্তি জার্মানির পক্ষ অবলম্বন করলে ভারতেরমুসলমান সম্প্রদায় বিব্রত হন। কারণ ধর্মীয় কারণে তারা খলিফার অনুগত, আবার অন্যদিকে রাজনৈতিক কারণে ব্রিটিশ সরকারের অনুগত থাকতেবাধ্য। নিজ দেশের সরকার হিসেবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয় মুসলমানরা ব্রিটিশ সরকারকেই সমর্থন দিয়েছে। তবে শর্ত ছিল যে এই সমর্থনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ সরকার তুরস্কের খলিফার কোনো ক্ষতি করবে না।কিন্তু যুদ্ধে জার্মানি হেরে গেলে তুরস্কের ভাগ্যবিপর্যয় ঘটে। যুদ্ধ শেষে জার্মানির পক্ষে যোগদানের জন্য ১৯২০ সালের সেভার্সের চুক্তি অনুযায়া শাস্তিস্বরূপ তুরস্ককে খণ্ড-বিখণ্ডিত করার পরিকল্পনা করা হয়। এতে ভারতীয় মুসলমানরা মর্মাহত হয় এবং ভারতীয় মুসলমানরা খলিফার মর্যাদা এবং তুরস্কের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলে, যা ইতিহাসে খিলাফত আন্দোলন নামে খ্যাত। এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন দুই ভাই মাওলানা মোহাম্মদ আলী, মাওলানা শওকত আলী এবং মওলানা আবুল কালাম আজাদ।

সমাধান দেখুন: ফরাসি বিপ্লব পরবর্তী ফ্রান্স পুর্নগঠনে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের গণমুখী সংস্কার মূল্যায়ন

(খ)
অসহযোগ আন্দোলন প্রকৃতি : ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের। অসহযোগ আন্দোলনের পেছনে বিভিন্ন কারণ ছিল। ১৯২০ খ্রিঃ মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। ১৯১৯ খ্রিঃ সংস্কার আইন ভারতবাসীর আশা-আকাঙ্খা পূরণে ব্যর্থ হয়। তাছাড়া ব্রিটিশ সরকারের দমননীতির কারণে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নতুন ধারার জন্ম দেয়। ১৯১৯ সালে সরকার রাওলাট আইন পাস করে। এই আইনে যেকোনো ব্যক্তিকে পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতার এবং সাক্ষ্য প্রমাণ ছাড়াই আদালতে দণ্ড দেয়ার ক্ষমতা পুলিশকে দেওয়া হয়। এই আইন ভারতের সর্বস্তরের মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। অহিংস আন্দোলনে বিশ্বাসী ভারতের রাজনীতিতে নবাগত (১৯১৭ খ্রিঃ যোগদান) মহাত্মা গান্ধীর ডাকে এই নিপীড়নমূলক আইনের বিরুদ্ধে ১৯১৯ খ্রিঃ ৬ এপ্রিল হরতাল পালিত রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে অন্যান্য স্থানের মতো পাঞ্জাবেও আন্দোলন গড়ে ওঠে। ১৩ এপ্রিল পাঞ্জাবের অমৃতসরে এক সভায় জেনারেল ডায়ারের নির্দেশে বহু নিরস্ত্র মানুষকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। ইতিহাসে এই নরকীয় হত্যাযজ্ঞের ঘটনা ‘জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড’ নামে পরিচিত। এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তের জন্য কংগ্রেস বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দকে নিয়ে এক তদন্তকমিটি গঠন করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ‘নাইট’ উপাধি বর্জন করেন। সরকারের দমননীতির পাশাপাশি চলে সংবাদপত্রে হস্তক্ষেপ। তাছাড়া মহাযুদ্ধের সৃষ্ট অর্থনৈতিক মহামন্দার কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি পেলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দেয়। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে গান্ধীজি হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ করে ১৯২৩ খ্রিঃ অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের আহ্বান জানান। ১৯২০ খ্রিঃ খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচির মাধ্যমে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯২১-২২ সাল পর্যন্তএই আন্দোলন সর্বভারতীয় গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়।

(গ)
খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের তাৎপর্য বিশ্লেষণ : খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন বিভিন্ন দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। এই আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতীয় মুসলমানরা যেমন প্রথমবারের মতো ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেয়, তেমন হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায় প্রথমবারের মতো ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে নামে। কিছুদিনের জন্য হলেও ব্রিটিশ বিভেদ ও শাসননীতি ব্যর্থ হয়। ফলে হিন্দুমুসলমান ঐক্য ও সম্প্রীতির এক রাজনৈতিক আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়। অপর দিকে এই ঐক্য ব্রিটিশ সরকারকে শঙ্কিত করে তোলে। এই আন্দোলন শুধু শিক্ষিত মুসলমান যুবকদের নয়, সারা ভারতের জনগণের মধ্যে এক রাজনৈতিক চেতনা ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছিল। তবে এই আন্দোলন এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্য দুই-ই ছিল ক্ষণস্থায়ী। আন্দোলনের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে আবার দূরত্ব সৃষ্টি হতে থাকে।

(ঘ)
লাহোর প্রস্তাবের প্রেক্ষাপট ও বৈশিষ্ট্য : ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনে বাংলার কৃতি সন্তান শেরে বাংলা একে ফজলুল হক যে প্রস্তাব। পাস করেন সে প্রস্তাব লাহোর প্রস্তাব নামে খ্যাত। লাহোর প্রস্তাবে বলা হয়, ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী সন্নিহিত স্থানসমূহকে অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। প্রয়োজনমতো সীমা পরিবর্তন করে যেসব স্থানে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ সেসব অঞ্চলসমূহের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।এসব স্বাধীন রাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলো হবে স্বায়ত্তশাসিত সার্বভৌম। রাহুল প্রস্তাবের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালের ১৪আগস্ট ভারত বিভক্ত হয়ে দুটি রাষ্ট্রের রূপান্তরিত হয়।

লাহোর প্রস্তাবের বৈশিষ্ট্য : ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ অবিভক্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিমলীগের অধিবেশনে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক “লাহোর প্রস্তাব” পেশ করেন। বিপুল পরিমাণ উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ২৪ মার্চ প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। নিচে লাহোর প্রস্তাবের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ দেওয়া হলো:

১. ভারতবর্ষকে বিভক্ত করে এর উত্তর-পশ্চিম ও পূর্ব অঞ্চলে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা গুলো নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ গঠন করতে হবে।

২. উল্লিখিত স্বাধীন রাষ্ট্র সমূহের অধীন ইউনিট বা প্রদেশগুলো স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম হবে।

৩. ভারতের অন্যান্য হিন্দু অঞ্চলগুলোর সমন্বয়ে পৃথক হিন্দু রাষ্ট্র গঠিত হবে।

৪. সংখ্যালঘু সম্প্রদায়েরপ্রস্তাবের তাৎপর্য সাথে পরামর্শ ভিত্তিতে তাদের স্বার্থ অধিকার ও রক্ষার জন্য সংবিধানের পর্যাপ্ত ক্ষমতা রাখতে হবে।

৫. প্রতিরক্ষা, পরস্বরাষ্ট্র ও যোগাযোগ ইত্যাদি বিষয়ে ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যগুলোর উপর ন্যস্ত থাকবে।

অবশেষে বলা যায় যে, ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব অবিভক্ত ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে অনন্যসাধারণ ভূমিকা পালন করে। লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হবার পর মুসলিম লীগের রাজনীতিতে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ উপস্থিত হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top