একটি দেশের জিডিপি নির্ভর করে সেই দেশের ভূমি, প্রাকৃতিক সম্পদ, শ্রম, মূলধন ও প্রযুক্তি ইত্যাদি সম্পদের পরিমাণ এবং উৎপাদনশীলতার উপর

অ্যাসাইনমেন্ট: “একটি দেশের জিডিপি নির্ভর করে সেই দেশের ভূমি, প্রাকৃতিক সম্পদ, শ্রম, মূলধন ও প্রযুক্তি ইত্যাদি সম্পদের পরিমাণ এবং উৎপাদনশীলতার উপর”-উক্ত তথ্যের আলােকে বাংলাদেশের মােট জিডিপি পরিমাপের পদ্ধতিগুলাের ব্যাখ্যাসহ মাথাপিছু জিডিপি পরিমাপের সূত্রটি উদাহরণসহ উপস্থাপন;

বিষয়বস্তু: জিডিপি পরিমাপের পদ্ধতিসমূহ ব্যাখ্যা। করতে পারবে বাংলাদেশে র মােট জিডিপি পরিমাপ পদ্ধতি বর্ণনা করতে পারবে;

নির্দেশনা:

  • ১. জিডিপির সংজ্ঞা ব্যাখ্যা
  • ২. জিডিপি পরিমাপের পদ্ধতি বর্ণনা
  • ৩. বাংলাদেশের জিডিপি পরিমাপের পদ্ধতি বর্ণনা
  • ৪. সূত্রের সাহায্যে মাথাপিছু জিডিপি নির্ণয়

পাঠ্যপুস্তক অনুসারে জিডিপি এর সংজ্ঞা প্রদানঃ

জাতীয় আয়ের ধারণাসমূহ (মোট দেশজ উৎপাদন)

GDP-র পুরো অর্থ “Gross Domestic Product” বা “মোট দেশীয় পন্য”। GDP-র সাহায্য কোনো দেশের অর্থনীতির অবস্থা বুঝতে পারা যায়। দেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে GDP একটি সূচক হিসেবে কাজ করে। একটি নির্দিষ্ট সময়ে সাধারণত এক বছরে একটি দেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে মোট যে পরিমাণ চূড়ান্ত দ্রব্য ও সেবা উৎপাদিত হয়, তার বাজার দামের সমষ্টিকে মোট দেশজ উৎপাদন বা GDP বলে।

মনে করি, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বছরে তিনটি দ্রব্য উৎপাদিত হয়। যেমন ১০০ কুইন্টাল ধান, ১০০০ জামা এবং ১০০০ কলম উৎপাদিত হয়। জিডিপি = ১০০ কুইন্টাল ধান প্রতি কুইন্টাল ধানের বাজার দাম + ১০০০ জামা প্রতিটি জামার বাজার দাম + ১০০০ কলম প্রতিটি কলমের বাজার দাম। এভাবে কোনো দেশে উৎপাদিত সকল দ্রব্যের পরিমাণকে নিজ নিজ দাম প্রতি এককের দ্বারা গুণ করে তার সমষ্টি বের করে জিডিপি নির্ণয় করা হয়। তবে ধান থেকে যদি চূড়ান্ত দ্রব্য হিসাবে চাল তৈরি হয়, তাহলে আমাদেরকে হিসাবের সময় ধানের বদলে চাল উৎপাদন এবং চালের দামকে হিসাবে নিতে হবে।

মোট জাতীয় আয় (Gross National Income বা GNI)

কোনো নির্দিষ্ট সময়ে সাধারণত আর্থিক বছরে কোনো দেশের নাগরিকগণ কর্তৃক যে পরিমাণ চূড়ান্ত দ্রব্য ও সেবা উৎপন্ন হয় তার বাজার মূল্যের সমষ্টিকে মোট জাতীয় আয় (GNI) বলে । মোট দেশজ উৎপাদনের সাথে নিট উপাদান আয় যোগ করে মোট জাতীয় আয় পাওয়া যায়। নিট উপাদান আয় বলতে একটি দেশের নাগরিকগণ বৈদেশিক বিনিয়োগ ও শ্রম থেকে যে আয় করে এবং বিদেশি নাগরিকগণ আলোচ্য দেশে বিনিয়োগ ও শ্রম থেকে যে আয় করে এ দুয়ের বিয়োগ ফলকে বোঝায়। এই পরিমাণটি ঋণাত্মক হলে মোট জাতীয় আয় মোট দেশজ আয়ের চেয়ে কম হবে। আর এটি যদি ধনাত্মক হয়, তাহলে মোট জাতীয় আয় মোট দেশজ আয়ের চেয়ে বেশি হবে। বাংলাদেশে বর্তমানে দ্বিতীয়টিই সত্য।

নিট জাতীয় আয় (Net National Income বা NNI)

কোনো দেশের মোট জাতীয় আয় থেকে মূলধন ব্যবহারজনিত অবচয় পুরণের ব্যয় (Capital Consumption Allowance Depreciation) বাদ দিলে যা থাকে তাকে নিট জাতীয় আয় বলে। মূলধন ব্যবহারজনিত অবচয় ব্যয় বলতে উৎপাদন ব্যবস্থায় মূলধনের ব্যবহারজনিত যে ক্ষয় হয়, তা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে ব্যয় বহন করতে হয়, তাকে বোঝায়।

জিডিপি পরিমাপের তিনটি পদ্ধতিঃ

একটি দেশের সকল জনগণ সম্পদ, শ্রম ও মূলধন ব্যবহার করে মোট যে পরিমাণ চূড়ান্ত দ্রব্য ও সেবাসমূহ উৎপাদন করে তার বাজার মূল্যকেজাতীয় আয় বলে। জাতীয় আয় পরিমাপ করার জন্য তিনটি পদ্ধতি ব্যবহার হয়ে থাকে।

১। উৎপাদন পদ্ধতি

২। আয় পদ্ধতি

৩। ব্যয় পদ্ধতি

১। উৎপাদন পদ্ধতি: উৎপাদন পদ্ধতিতে প্রথমে একটি নিদিষ্ট সময়ে সাধারনত এক বছর একটি দেশের সকল জনগণ দ্বারা যে পরিমাণ চূড়ান্ত দ্রব্য ও সেবা উৎপাদিত হয় তার আর্থিক মূল্য হিসাব করে মোট জাতীয় উৎপাদন (GNP) নির্ণয় করা হয়।

বদ্ধ অর্থনীতিতে GNP = GDP হয়। আবার মুক্ত অর্থনীতির GDP এর সাথে নীট রপ্তানি আয় (X-M) যুক্ত হয়।

অর্থাৎ GNP= GDP+(X-M)| GNP হতে মূলধনী দ্রব্যের ক্ষয়-ক্ষতিজনিত ব্যয় (CCA) বিয়োগ করলে NNP পাওয়া যায়, অর্থাৎ NNP= GNP- CCA

এখানে, CCA মূলধনী দ্রব্যের ক্ষয়-ক্ষতি জনিত ব্যয়।

এখন নীট জাতীয় উৎপাদন হতে পরোক্ষ কর (Ti), হস্তান্তর পাওনা (Tr) এবং সরকারের উদ্বৃত্ত মুনাফা (Sg) বিয়োগ

করে এবং সরকারি ভর্তুকি(Sg) যোগ করলে জাতীয় আয় (Y) পাওয়া যায়। অর্থাৎ,

Y= NNP- (Ti+Tr+Sg)+Sb

বা, Y=NNP-Ti-Tr-Sg+Sb

২। আয় পদ্ধতি: আয় পদ্ধতি অনুসারে উৎপাদনের সকল উপকরণের আয় যোগ করলে জাতীয় আয় পাওয়া যায়। উৎপাদনের চারটি উপকরণ ভূমি, শ্রম, মূলধন ও সংগঠনের নিজ নিজ আয় সমূহ হচ্ছে যথাক্রমে খাজনা, মজুরি, সুদ ও মুনাফা। জাতীয় আয় হচ্ছে এ চার ধরণের আয়ের যোগফল। অন্যদিকে, ব্যক্তিগত আয়ের মধ্যে যদি হস্তান্তর পাওনা অন্তর্ভূক্ত থাকে তাহলে সেটি বিয়োগ করতে হবে। কারণ হস্তান্তর পাওনা জাতীয় আয়ে অন্তর্ভূক্ত হয় না।

জাতীয় আয়= খাজনা+ মজুরি+সুদ+ মুনাফা- হস্তান্তর পাওনা।

৩। ব্যয় পদ্ধতি: ব্যয় পদ্ধতিতে একটি দেশে একটি নির্দিষ্ট সময়ে (সাধারণত এক অর্থবছরে) মোট ভোগ ব্যয় ও বিনিয়োগ ব্যয় যোগ করলে জাতীয় আয় পরিমাপ করা যায়। এক বছরে উৎপাদন কার্যের ফলে যে মোট আয় হয় তার একটি অংশ ভোগের জন্য ব্যয় হয় এবং বাকি অংশ সঞ্চয় হয়। আর এ সঞ্চয় পূণরায় উৎপাদন কাজে ব্যয় হয় যেটাকে আমরা বিনিয়োগ বলে থাকি। আর এ বিনিয়োগকে বিনিয়োগ ব্যয় বলা হয়। অতএব বলা যায় যে, একটি অর্থবছরে দেশে যে ভোগ ব্যয় হয় এবং মূলধন সম্পদ বৃদ্ধির জন্য যে বিনিয়োগ হয় তাদের সমষ্টিই হল জাতীয় আয়।

অর্থাৎ জাতীয় আয়= মোট ভোগ ব্যয়+ মোট বিনিয়োগ ব্যয়

বা, Y= C+I

অন্যদিকে মুক্ত অর্থনীতিতে সরকারি খাত এবং আমদানি-রপ্তানি বিবেচনা করতে হয়। তাই এ খাতগুলো বিবেচনা করলে ব্যয় পদ্ধতিতে জাতীয় আয় হবে, মোট ভোগ ব্যয় (C), মোট বিনিয়োগ ব্যয় (I), মোট সরকারি ব্যয় (G) এবং নীট রপ্তানি আয় (X-M) এর যোগফল। অর্থাৎ Y= C+I+G+(X-M)

বাংলাদেশে মোট দেশজ আয় পরিমাপ পদ্ধতি

বাংলাদেশে জিডিপি গণনার দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রতি বছর চলতি বাজার মূল্য ও স্থির মূল্যে দ্রব্য ও সেবার মূল্য পরিমাপ করে জিডিপি গণনা করে থাকে। এসব হিসাব করতে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে থাকে ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো উৎপাদন পদ্ধতি ও ব্যয় পদ্ধতি ব্যবহার করে জিডিপি ও জিএনআই গণনা করে । উৎপাদন পদ্ধতিতে মোট দেশজ উৎপাদন (GDP) পরিমাপের জন্য অর্থনীতিকে মোট ১৫টি প্রধান খাতে বিভক্ত করা হয়। খাতসমূহ হচ্ছে-

১. কৃষি ও বনজ সম্পদ : কৃষি দেশজ উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এ খাত ধরাবাধাভাবে হিসাব করা কঠিন। বাংলাদেশে GDP গণনা করতে এ খাতকে তিনটি উপখাতে বিভক্ত করা হয় ।

2. বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানিসম্পদ এ খাতে সেবা সরবরাহ মূল্যের পরিপ্রেক্ষিতে মোট দেশজ উৎপাদন মূল্য হিসাব করা হয়। বাংলাদেশের জন্য এই খাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের পাশাপাশি এ খাতসমূহ বেসরকারিভাবেও ছেড়ে দেয়া হয়েছে। ২০১৭-১৮ সালে মোট দেশজ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ২৯৩৩৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে-

.৩ শিল্প (ম্যানুফেকচারিং): বাংলাদেশে মোট দেশজ উৎপাদন গণনার ক্ষেত্রে সকল শিল্পের উৎপাদিত পণ্যের বর্তমান বাজারমূল্য হিসাব করে মোট দেশজ উৎপাদন বের করা হয়। বাংলাদেশে শিল্প উৎপাদনের পরিমাণ ২০১৭-১৮ সালে শিল্প উৎপাদন বৃহৎ ও মাঝারি শিল্প উৎপাদন এবং ক্ষুদ্র শিল্প উৎপাদন যথাক্রমে ৩৩২৫৯৪ কোটি টাকা এবং ৭১৫৫১ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ সালে শিল্প উৎপাদন বৃহৎ ও মাঝারি শিল্প উৎপাদন এবং ক্ষুদ্র শিল্প উৎপাদন যথাক্রমে ৩৯৯৮৬০ কোটি টাকা, ৮২১৮৮ কোটি টাকা।

৪. খনিজ ও খনন : শিল্প খাতের মধ্যে খনিজ ও খননকে আলাদা খাত হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। এ খাতে (ক) প্রাকৃতিক গ্যাস ও অপরিশোধিত তেল এবং (খ) অন্যান্য খনিজ সম্পদ ও খনন বিষয়ের উৎপাদিত পণ্যের বাজারমূল্যের হিসাব করা হয়। এসব খাতের হিসাব দেশজ উৎপাদনের দিক থেকে গণনা করা হয়। ২০১৭-১৮ সালে এ খাতে আয় হয় ৩৮৮৮৪ কোটি টাকা এবং ২০১৮-১৯ সালে হিসাব করা হয়েছিল ৪৪০৩৯ কোটি টাকা।

৫. নির্মাণ : নির্মাণ খাত থেকে মোট দেশজ উৎপাদনের পরিমাণ হিসাব করা হয় ব্যক্তি, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, ভোক্তা এবং সরকারের প্রাপ্ত তথ্য থেকে বাস্তবে এ খাত থেকে যে পরিমাণ আয় হিসাব হওয়ার কথা তার তুলনায় কম হয়। কারণ চলতি বাজারমূল্য সরকার প্রদত্ত বেঁধে দেয়া মূল্য থেকে বেশি ।

৫. মৎস্য সম্পদ : অভ্যন্তরীণ ও সামদ্রিক উৎস থেকে মোট মৎস্য আহরণের প্রেক্ষিতে মোট দেশজ উৎপাদনের হিসাব করা হয়। এখাতে ২০১৭-১৮ সালে মোট দেশজ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৬৬৮৮২ কোটি টাকা এবং ২০১৮-১৯ সালে ৭৪৮২৮ কোটি টাকা ।

৭. পাইকারি ও খুচরা বিপণন এ হিসাবে পণ্যের পাইকারি মূল্য হিসাবের মাধ্যমে মোট দেশজ উৎপাদনের পরিমাণ গণনা করা হয়। ২০১৭-১৮ সালে ২৭৯৮২৩ কোটি টাকা এবং ২০১৮-১৯ সালে ৩১১২০৪ কোটি টাকা হিসাব করা হয়।

অথচ সরকারি বেঁধে দেয়া মূল্যের পরিপ্রেক্ষিতে মোট দেশজ উৎপাদনের পরিমাণ হিসাব করা হয়। ২০১৭-১৮ সালে এ খাত থেকে আয় হয় ১৬৯৮৫৫ কোটি টাকা এবং ২০১৮-১৯ সালে ১৯৬৬৫৬ কোটি টাকা। হোটেল ও রেস্তোরাঁ এই খাতের মোট দেশজ উৎপাদনের বিষয়টি উৎপন্ন দ্রব্যের ও সেবার বিক্রয় মূল্যের প্রেক্ষিতে হিসাব করা হয়। ২০১৭-১৮ সালে এ খাত থেকে আয় হয় ২২১২৩ কোটি টাকা এবং ২০১৮-১৯ সময়ে ২৫২৮০ কোটি টাকা।

৮. পরিবহণ, সংরক্ষণ ও যোগাযোগ : এ খাত দেশজ আয় গণনার একটি বড় খাত। এ খাতটির বড় অংশ বেসরকারি হাতে ন্যাস্ত আছে। তারপরও ২০১৭-১৮ সালে স্থুল আয় হয়েছিল মোট ২০৪৬৩০ কোটি টাকা যার মধ্যে।

সূত্রের সাহায্যে মাথাপিছু জিডিপি নির্ণয়ঃ

মনে করি, ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে এটি দেশের মধ্যে অবস্থানরত সকল জনগণের ভোগ ব্যয় ৫০ লক্ষ টাকা, মোট বিনিয়োগ ব্যয় ২৫ লক্ষ টাকা এবং সরকারি ব্যয় ১০ লক্ষ টাকা।এবং এই দেশের বর্তমান মোট জনসংখ্যা ১ কোটি। এরূপ পরিস্থিতিতে মাথাপিছু দেশজ উৎপাদন বা মাথাপিছু অভ্যন্তরীণ উৎপাদন নির্ণয়-

আমরা জানি,

Gross Domestic Product (GDP) = C+I+G

মোট দেশজ উৎপাদন = ভোগ+বিনিয়োগ+সরকারি ব্যয়

= ৫০+২৫+১০ লক্ষ টাকা

= ৮৫ লক্ষ টাকা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top